‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’
ইউরোপজুড়ে বোমা আতঙ্ক, বিমান থেকে সংবাদমাধ্যম—টার্গেট সর্বত্র
ইউরোপ প্রতিনিধি, ৭ নভেম্বর:
ইউরোপজুড়ে একের পর এক বোমা হামলার হুমকিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যাত্রীবাহী বিমান, বিমানবন্দর, বিমান সংস্থা থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এই আতঙ্ক। গত কয়েক দিনে ৩০টির বেশি ফ্লাইট বোমা হামলার হুমকির মুখে পড়েছে। সর্বশেষ শুক্রবার আয়ারল্যান্ড ও বুলগেরিয়ার সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে হুমকি আসার পর নতুন করে নিরাপত্তা তৎপরতা শুরু হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের যাত্রীবাহী বিমানে ই-মেইল ও অন্যান্য মাধ্যমে বোমা হামলার হুমকি পাঠানো হচ্ছে। এসব হুমকির কারণে কয়েকটি বিমানকে নির্ধারিত গন্তব্যের পরিবর্তে অন্য বিমানবন্দরে অবতরণ করতে হয়েছে। কোথাও কোথাও যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে যাত্রীবাহী বিমানকে নিরাপত্তা পাহারা দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, চেক প্রজাতন্ত্র, বুলগেরিয়া, স্পেন, পোল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশের বিমান চলাচল এই হুমকির প্রভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। লন্ডন থেকে সোফিয়াগামী একটি বিমানকে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে এবং ডাবলিন থেকে রোমগামী একটি এয়ার লিঙ্গাস বিমানকে ফ্রান্সের সামরিক বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করানো হয়। দ্বিতীয় বিমানটিতে ১৫১ জন যাত্রী ও ছয়জন ক্রু ছিলেন। সবাই নিরাপদে অবতরণ করেন।
শুক্রবারও চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাগে আসা-যাওয়া করা নয়টি ফ্লাইটে বোমা হামলার হুমকি পাওয়া যায়। ইতালির প্রাগ থেকে রোমগামী একটি উইজ এয়ারের বিমান ভেনিসে অবতরণ করে। ফ্রান্সের আকাশসীমায় চলাচলকারী চারটি বিমানের ক্ষেত্রেও নতুন করে হুমকি আসে। ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিমানবন্দরেও নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়। তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।
এবার সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়েও বোমা আতঙ্ক

বিমান চলাচলে হুমকির পর শুক্রবার নতুন করে আতঙ্ক ছড়ায় সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়গুলোতে। আয়ারল্যান্ডের জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিইর (RTÉ) কার্যালয়ে বোমা হামলার হুমকি পাওয়ার পর কর্মীদের ভবন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। একই ধরনের হুমকির কারণে আইরিশ ইন্ডিপেনডেন্ট, নিউস্টক, টুডে এফএম এবং ভার্জিন মিডিয়ার কার্যালয়েও নিরাপত্তা তৎপরতা চালানো হয়।
বুলগেরিয়ার টেলিভিশন চ্যানেল নোভা টিভি এবং যুক্তরাজ্যের সম্প্রচারমাধ্যম স্কাইও নিরাপত্তা হুমকির কথা জানিয়েছে। স্কাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছে।
আয়ারল্যান্ডের আরটিই এবং বুলগেরিয়ার নোভা টিভিতে পাঠানো ই-মেইলে 'মিখাইল আন্দ্রোপভ' নামে এক ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে। 'মেসেজ টু দ্য ওয়েস্ট' শিরোনামের বার্তায় ইউরোপের পরিবহন ব্যবস্থায় আরও হামলার হুমকি দেওয়া হয়। তবে ওই ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে কে, ই-মেইল কোথা থেকে পাঠানো হয়েছে কিংবা বিমান ও সংবাদমাধ্যমের হুমকিগুলোর পেছনে একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সন্দেহ, নিশ্চিত প্রমাণ নেই
ইউরোপের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশ এসব ঘটনাকে সমন্বিত 'হাইব্রিড হামলা' বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ বলে সন্দেহ করছেন। ইউক্রেন যুদ্ধে ইউরোপের সমর্থনের কারণে রাশিয়াকে ঘিরেও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশ বা গোয়েন্দা সংস্থা হামলাগুলোর জন্য নির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রকে দায়ী করে চূড়ান্ত প্রমাণ হাজির করেনি। মস্কোও এ ধরনের নাশকতায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস ঘটনাগুলোকে সম্ভাব্য 'হাইব্রিড আগ্রাসন' ও 'মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, একই ধরনের পদ্ধতিতে এতগুলো ঘটনা ঘটাকে নিছক কাকতালীয় হিসেবে দেখার সুযোগ কম।
ইতালির রোম ও মিলানের কয়েকটি বিমান সংস্থা ও বিমানবন্দরেও 'মেল স্টেট' নামে রাশিয়ায় নিষিদ্ধ একটি উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীর পরিচয় ব্যবহার করে হুমকি পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে বর্তমান ঘটনাগুলোর প্রকৃত সম্পর্কও এখনো নিশ্চিত নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত এসব হুমকির ঘটনায় কোনো বিমানে বা সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে বিস্ফোরক পাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট বিমানগুলো নিরাপদে অবতরণ করেছে এবং নিরাপত্তা তল্লাশিতে বিস্ফোরক বা সন্দেহজনক বস্তু মেলেনি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা হুমকির উৎস শনাক্ত করতে তদন্ত চালাচ্ছেন।