‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

মার্কিন রাজনীতিতে মুসলিমদের জয় জয়কার , ৯৭ প্রার্থী নির্বাচিত

মার্কিন রাজনীতিতে মুসলিমদের জয় জয়কার , ৯৭ প্রার্থী নির্বাচিত

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৭ নভেম্বর :

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মুসলিম আমেরিকানদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় নতুন ইতিহাস তৈরি হয়েছে। ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে কংগ্রেস, সিনেট, অঙ্গরাজ্যের আইনসভা, বিচার বিভাগ, স্থানীয় সরকার ও শিক্ষা বোর্ডে মুসলিম প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো, মিশিগান থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের বিজয়। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন মুসলিম সরাসরি নির্বাচিত হয়ে মার্কিন সিনেটে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (CAIR) এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন CAIR Action-এর ৫ নভেম্বর প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে অন্তত ২১টি অঙ্গরাজ্যে ৯৭ জন মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৮ জন অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় নির্বাচিত হয়েছেন। আরও ১৫ জন প্রার্থী ভোট গণনায় এগিয়ে ছিলেন এবং ছয়টি আসনের ফল তখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে সব ভোট গণনা শেষে বিজয়ীর সংখ্যা ১০০ ছাড়াতে পারে বলে সংগঠনটি ধারণা করছে। তবে এই হিসাব প্রাথমিক; সব আসনের আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার পর সংখ্যায় পরিবর্তন হতে পারে। 

সিনেটে প্রথম মুসলিম আবদুল এল-সায়েদ

নির্বাচনের সবচেয়ে ঐতিহাসিক বিজয় এসেছে মিশিগান থেকে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ৪২ বছর বয়সী আবদুল রহমান মোহাম্মদ এল-সায়েদ রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন। তিনি মিশিগানের সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং চিকিৎসক। মিশিগানের জনস্বাস্থ্য বিভাগের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।

মিশিগানে মিসরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠা এল-সায়েদ রাজনীতিতে স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, সাধারণ মানুষের চিকিৎসার অধিকার এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁর মুসলিম পরিচয় নিয়ে বিরূপ মন্তব্য ও নানা অভিযোগ ওঠে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাঁকে নিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু এসব বিতর্কের মধ্যেও তিনি নির্বাচনে জয়ী হন।

বিজয়ী ভাষণে নিজের পুরো নাম উচ্চারণ করে তিনি বলেন, তাঁকে নাম ধরে ডাকতে অসুবিধা হলে আগামী জানুয়ারিতে সিনেটে শপথ নেওয়ার পর তাঁকে সিনেটর বলে ডাকলেই চলবে।

তাঁর এই বিজয় শুধু একটি আসন জয় নয়; যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কক্ষে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের নতুন অধ্যায়। 

গাজায় আহতদের চিকিৎসা করা চিকিৎসক এখন কংগ্রেসে

নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আদম হামাউই। তিনি একজন মিসরীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন চিকিৎসক ও শল্যচিকিৎসক। ইরাক যুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনীর চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরে গাজায় স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসক হিসেবে আহত ফিলিস্তিনিদের চিকিৎসা করেন।

গাজায় যুদ্ধাহত শিশু ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় তাঁর অভিজ্ঞতা নির্বাচনী প্রচারণায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। রিপাবলিকান প্রার্থী গ্রেগ মেলেকে পরাজিত করে তিনি নিউ জার্সি থেকে প্রথম মুসলিম হিসেবে মার্কিন কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়েছেন।

তাঁর বিজয় চিকিৎসা, মানবিক দায়িত্ব ও রাজনীতির মধ্যে একটি বিশেষ যোগসূত্র তৈরি করেছে। 

নিউইয়র্কে দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়েরের বিজয়

নিউইয়র্কের ১৩তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের। মুসলিম প্রার্থী হিসেবে তাঁর বিজয়ও এবারের নির্বাচনে আলোচিত হয়েছে। তিনি নতুন করে কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ তৈরি করেছেন।

অন্যদিকে মিনেসোটা থেকে ইলহান ওমর, মিশিগান থেকে রাশিদা তালাইব, ইন্ডিয়ানা থেকে আন্দ্রে কারসন এবং ক্যালিফোর্নিয়া থেকে লতিফা সিমন নিজেদের আসন ধরে রেখেছেন। তাঁদের প্রত্যেকেই মার্কিন রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের পরিচিত মুখ।

বিশেষ করে ইলহান ওমর ও রাশিদা তালাইব দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসী অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, ফিলিস্তিন এবং স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কংগ্রেসে সরব ভূমিকা পালন করে আসছেন।

অঙ্গরাজ্যের রাজনীতিতেও মুসলিমদের অগ্রগতি

মুসলিম প্রার্থীদের সাফল্য শুধু ওয়াশিংটনের কংগ্রেস বা সিনেটেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভাতেও তাঁদের উপস্থিতি বেড়েছে।

ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সিনেট আসনে জয়ী হয়েছেন নাবিলা সাইয়েদ। তিনি তরুণ মুসলিম আমেরিকান রাজনীতিকদের মধ্যে পরিচিত মুখ।

জর্জিয়ায় শেখ রহমান অঙ্গরাজ্যের সিনেট আসন ধরে রেখেছেন। একই অঙ্গরাজ্যে ফারুক মুঘল প্রতিনিধি পরিষদে নিজের আসন পুনরুদ্ধার করেছেন। কানেকটিকাটে মেরিয়াম খান, সৌদ আনোয়ার ও এমডি রহমান অঙ্গরাজ্যের সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন।

এ ছাড়া মিনেসোটায় জয়নাব মোহাম্মদ, মিনেসোটা ও অন্যান্য অঙ্গরাজ্যে আরও কয়েকজন মুসলিম প্রার্থী আইনসভায় জয় পেয়েছেন। পেনসিলভানিয়া, মিশিগান, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও ও টেক্সাসেও মুসলিম প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়েছেন।

নিউইয়র্কের অঙ্গরাজ্য সিনেটে আবের কাওয়াসের বিজয়ও উল্লেখযোগ্য। CAIR-এর তালিকা অনুযায়ী, তিনি নিউইয়র্কের আইনসভায় নির্বাচিত প্রথম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ও প্রথম মুসলিম নারী। 

স্থানীয় সরকার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নতুন মুখ

এবারের নির্বাচনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো স্থানীয় সরকার ও শিক্ষা বোর্ডে মুসলিম প্রার্থীদের সাফল্য। মিশিগানের অ্যান আরবার শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন ইউসুফ রাবহি। নিউ জার্সির প্রসপেক্ট পার্কের মেয়র হয়েছেন মোহাম্মদ টি. খাইরুল্লাহ।

টেক্সাসের অস্টিন সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত হয়েছেন জোহাইব জো কাদরি। ভার্জিনিয়ার হারন্ডন টাউন কাউন্সিলেও জয় পেয়েছেন ইয়াসমিন শফিক।

শিক্ষা বোর্ডের নির্বাচনে মিশিগানের ডিয়ারবর্ন, হ্যামট্রামক এবং নিউ জার্সির বিভিন্ন এলাকায় একাধিক মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে শওকত চৌধুরী, তাজিয়া মিয়া ও এমাদ শামাখের নাম উল্লেখযোগ্য।

এই সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ স্থানীয় সরকার ও শিক্ষা বোর্ডের সিদ্ধান্ত অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা, নাগরিক সুবিধা, আবাসন এবং সামাজিক পরিবেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

পরিচয়ের রাজনীতি ছাড়িয়ে প্রতিনিধিত্বের নতুন অধ্যায়

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এক দিনে তৈরি হয়নি। কয়েক দশক ধরে অভিবাসী পরিবার, নাগরিক অধিকার আন্দোলন, শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম এবং স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে এই অংশগ্রহণ বিস্তৃত হয়েছে।

এবারের নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীদের সাফল্যের পেছনে স্বাস্থ্যসেবা, মূল্যস্ফীতি, আবাসন ব্যয়, কর্মসংস্থান, গাজা ও ইরান যুদ্ধ এবং মুসলিমবিদ্বেষের মতো বিষয়গুলোও আলোচনায় এসেছে। নির্বাচনের পর প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসব বিষয় মুসলিম ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান ও অংশগ্রহণে প্রভাব ফেলেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—৯৭ জন মুসলিম প্রার্থীর বিজয় মানেই তাঁরা সবাই একই রাজনৈতিক মতাদর্শ বা পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেন, এমন নয়। তাঁদের রাজনৈতিক দল, নির্বাচনী অঙ্গীকার ও স্থানীয় অগ্রাধিকার ভিন্ন। মুসলিম পরিচয় তাঁদের একটি ধর্মীয় পরিচয়ে যুক্ত করলেও রাজনৈতিক অবস্থানে তাঁরা একক কোনো গোষ্ঠী নন।

যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্বাচনী ফলাফল বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি দেখিয়েছে, একটি বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় রাষ্ট্রে নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীও রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

আবদুল এল-সায়েদের সিনেট বিজয় তাই শুধু একজন মুসলিম রাজনীতিকের ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি আমেরিকার রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসে একটি নতুন সংযোজন।