ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
বরেণ্য চিত্রশিল্পী, নাট্যব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার, আইসিইউতে নিবিড় পর্যবেক্ষণে
সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর: দেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী, নাট্যব্যক্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক সংগঠক মুস্তাফা মনোয়ার গুরুতর অসুস্থ হয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নিউমোনিয়ার সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ায় তাকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-তে রাখা হয়েছে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ১৪ জুন শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সে সময় তার রক্তচাপ ও শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যায়। পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর থেকে তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে লন্ডনে বসবাসরত শিল্পীর ভাগনি কবি ফাহমিদা মঞ্জু মজিদ জানান, হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার শ্বাসকষ্ট ও শারীরিক দুর্বলতা বেশ বেড়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করার পর নিউমোনিয়াজনিত জটিলতা শনাক্ত করা হয়। বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল তার চিকিৎসা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে।
শিল্পীর স্ত্রী মেরী মনোয়ার স্বামীর শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ১৪ জুন শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে মুস্তাফা মনোয়ারকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে আইসিইউতে রাখার সিদ্ধান্ত নেন।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তি মুস্তাফা মনোয়ারের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার জন্য শুভকামনা জানিয়ে অনেকেই বার্তা দিচ্ছেন। দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি জগতে দীর্ঘ কয়েক দশকের অবদানের কারণে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত।
এর আগে ২০২৪ সালে প্রোস্টেট ক্যানসারজনিত জটিলতায়ও তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। পরবর্তীতে বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে তিনি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। তবে প্রায় দুই বছর পর আবারও গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় তার শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নিউমোনিয়া বিশেষ করে প্রবীণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পরিবার দেশবাসীর কাছে শিল্পীর সুস্থতার জন্য দোয়া ও শুভকামনা কামনা করেছে।
বাংলাদেশের শিল্প, শিশুতোষ অনুষ্ঠান, নাট্যচর্চা এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত থাকা মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। তার অসুস্থতার খবরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে উদ্বেগের পাশাপাশি দ্রুত আরোগ্যের প্রত্যাশাও জোরালো হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের প্রথিতযশা কবি গোলাম মোস্তফার কনিষ্ট সন্তান শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার ১৯৩৫ সালে মাগুরায় জন্মগ্রহণ করেন। ‘কোলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়’ থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে ১৯৫৯ সালে পাস করেন।
তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল আর্ট কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে। পরে তিনি পাপেট শোয়ের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিতি পান। টেলিভিশনে শিশুদের জন্য তার তৈরি বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করেছে। তিনি বিটিভি, শিল্পকলা একাডেমি ও এফডিসির গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশে পাপেট শিল্পের বিকাশে তার অনন্য অবদান রয়েছে।
সাফ গেমসের মিশুক ও শহীদ মিনারের লাল সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপনসহ শিল্পের নানা ক্ষেত্রে সৃজনশীল ভূমিকা রেখেছেন।
১৯৭১ সালের ‘সংগ্রাম সংগ্রাম’ গানের নির্দেশনা এবং বিটিভির ‘নতুন কুঁড়ি’ ও ‘রক্তকরবী' নাটক তার উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি। শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০০৪ সালে একুশে পদক এবং ২০১৯ সালে সুলতান স্বর্ণ পদকে ভূষিত হন তিনি।