বিশ্ব সংগীত দিবস উপলক্ষে

সুরের সেতুবন্ধনে ব্রিটেন: সংগীত যেখানে বহুসংস্কৃতির মিলনমেলা

সুরের সেতুবন্ধনে ব্রিটেন: সংগীত যেখানে বহুসংস্কৃতির মিলনমেলা

ভয়েস অব পিপল ডেস্ক:  ২১ জুন বিশ্ব সংগীত দিবস। পৃথিবীর নানা দেশে এই দিনটি পালিত হচ্ছে সংগীতের সার্বজনীন শক্তি ও মানবিক বার্তার উদযাপন হিসেবে। তবে বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র হিসেবে ব্রিটেনে এই দিবসের তাৎপর্য যেন আরও গভীর। এখানে সংগীত শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সংস্কৃতির সেতুবন্ধন, সামাজিক সম্প্রীতির ভাষা এবং অভিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয় ধরে রাখার অন্যতম শক্তি।

লন্ডনের রাস্তায় হাঁটলে একদিনেই শোনা যায় আফ্রিকান ড্রাম, ভারতীয় সেতার, আরবি সুর, জ্যাজ, রক কিংবা ক্লাসিক্যাল অর্কেস্ট্রার ধ্বনি। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের বসবাস এই দেশে। ফলে সংগীত এখানে এক অনন্য সাংস্কৃতিক সংলাপের জন্ম দিয়েছে। ভাষা ভিন্ন, ধর্ম ভিন্ন, ইতিহাস ভিন্ন—কিন্তু সুরের সামনে সেই সব পার্থক্য অনেকটাই মুছে যায়।

বিশ্ব সংগীত দিবসে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরে পার্ক, স্কয়ার, কমিউনিটি সেন্টার এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে সংগীত পরিবেশনার আয়োজন দেখা যায়। স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি অংশ নেন বিভিন্ন দেশের সংগীতশিল্পীরাও। অনেক জায়গায় রাস্তার শিল্পীরা খোলা আকাশের নিচে গান পরিবেশন করেন। সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই উৎসবে যুক্ত হন।

ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছেও সংগীতের গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহ্যাম কিংবা বার্মিংহাম ও ম্যানচেস্টারের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, লোকসংগীত এবং আধুনিক বাংলা গানের চর্চা দীর্ঘদিনের। নতুন প্রজন্মের অনেক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণ-তরুণী বাংলা গান শেখার মাধ্যমে নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখছে।

সংগীতের আরেকটি বড় শক্তি হলো এটি মানসিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আধুনিক ব্রিটিশ জীবনে কর্মব্যস্ততা, একাকীত্ব এবং মানসিক চাপ বাড়ছে। চিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই বলছেন, সংগীত মানুষের উদ্বেগ কমাতে, মনোযোগ বাড়াতে এবং মানসিক প্রশান্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। এজন্য অনেক হাসপাতাল, কেয়ার হোম এবং কমিউনিটি প্রকল্পেও সংগীতভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

ডিজিটাল যুগে সংগীতের বিস্তার আরও সহজ হয়েছে। স্মার্টফোনের একটি স্পর্শেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের সংগীত এখন শোনা যায়। তবে প্রযুক্তির এই সুবিধার মাঝেও সরাসরি সংগীত পরিবেশনার আবেদন কমে যায়নি। বরং মানুষ আবারও কমিউনিটি, সংস্কৃতি এবং মানবিক সংযোগের খোঁজে সংগীতের কাছে ফিরে আসছে।

বিশ্ব সংগীত দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী যতই বিভক্ত হোক না কেন, কিছু বিষয় এখনো মানুষকে একত্র করে রাখতে পারে। সংগীত তার অন্যতম। এটি কোনো পাসপোর্ট চায় না, কোনো ভিসা চায় না, কোনো ভাষার অনুবাদও প্রয়োজন হয় না। একটি সুন্দর সুর কখনো কখনো এমন অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে, যা হাজার শব্দেও সম্ভব নয়।

আজকের এই দিনে ব্রিটেনের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে সংগীতের বার্তা তাই একটাই—ভিন্নতার মধ্যেও আমরা একসঙ্গে থাকতে পারি। কারণ মানুষের হৃদয়ের ভাষা শেষ পর্যন্ত একই, আর সেই ভাষার সবচেয়ে মধুর প্রকাশ হলো সংগীত।