দাওরাই জনপদের ইতিহাস- ২য় পর্ব ।। শেখ এ কে এম জাকারিয়া ।।

দাওরাই জনপদের ইতিহাস- ২য় পর্ব ।। শেখ এ কে এম জাকারিয়া ।।

দাওরাই জনপদের ইতিহাসে মোকাম ও মাজারের পরিচয় একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। স্থানীয় গবেষক ও প্রবীণদের মতে, এ দুটি স্থানকে একই মনে করা হলেও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

গবেষক এ এস এম ওয়াজেদ-এর ভাষ্যমতে, দাওরাই গ্রামে অবস্থিত স্থানটি মূলত হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর বসতিস্থলভিত্তিক মোকাম। অন্যদিকে, বড় ফেচী মৌজায় অবস্থিত পবিত্র স্থানটি একই সঙ্গে মাজার ও মোকাম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

স্থানীয় গবেষকদের দাবি, বর্তমানে বড় ফেচী মৌজায় যে মাজারটি ‘শাহ ফছিহ্ (রহ.)’ নামে পরিচিত, সেটিই প্রকৃতপক্ষে হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর আসল মাজার

তাঁদের মতে, এসএ রেকর্ড-পূর্ববর্তী বিভিন্ন দলিল, মাঠ পরচা, ফলক এবং প্রাচীন গ্রন্থে এই স্থানের সঙ্গে হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর নামের উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল সামাজিক মর্যাদা ও অন্যান্য সুবিধা লাভের উদ্দেশ্যে এ স্থানের পরিচয় পরিবর্তন করে ‘শাহ হাফেজ ফছিহ’ নামে প্রচার করতে শুরু করে।

গবেষকদের মতে, ১৯৯৬ সালে একটি বিতর্কিত গ্রন্থ প্রকাশ এবং ২০০৯ সালে নতুন গেইট-ফলক নির্মাণের পর এ নিয়ে বিভ্রান্তি আরও বৃদ্ধি পায়।

তবে স্থানীয়দের দাবি, পুরোনো গেইটের ফলকের ছবি, আরএস মাঠ পরচা, এসএ খতিয়ান ৪৩/০, এসএ দাগ ১৮০৭, ডিপি আরএস দাগ ১৫৯৬ এবং ফাইনাল ১ নম্বর খতিয়ানে জমির শ্রেণি ‘দরগাহ’ হিসেবে উল্লেখ থাকাসহ বিভিন্ন দলিল এই স্থানের প্রকৃত পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বহন করে।

আরও একটি বিষয় স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বড় ফেচী মৌজার মাজারেও বসতিস্থলের মতো একটি ‘আম্বল তাজ বৃক্ষ’ রয়েছে, যা হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর স্মৃতিবাহী নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে দুটি স্থানের মধ্যে একটি পার্থক্যও রয়েছে। বসতিস্থলের বৃক্ষটি বর্তমানে ছোট ও মৃতপ্রায় হলেও মাজারের বৃক্ষটি এখনো বৃহৎ ও জীবন্ত অবস্থায় রয়েছে।

প্রশাসনিক ইতিহাসে দাওরাইয়ের গুরুত্ব

দাওরাইয়ের ইতিহাস শুধু আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রশাসনিক ও রাজস্ব ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-এর শাসনামলে সুবে বাংলাকে ১৩টি চাকলায় বিভক্ত করা হলে সিলেট একটি স্বতন্ত্র চাকলা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। পরবর্তীকালে সিলেটকে ১০টি রাজস্ব জেলায় ভাগ করা হয়। এর মধ্যে সপ্তম রাজস্ব জেলার নাম ছিল রসূলগঞ্জ, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান জগন্নাথপুর অঞ্চল।

গবেষক এ এস এম ওয়াজেদের মতে, এই রাজস্ব জেলার সূচনালগ্নে একমাত্র পরগণার নাম ছিল আতুয়াজান। ইতিহাস থেকে জানা যায়, এক সম্মানিত নারী আতুয়াজান বিবি-র নামানুসারেই এই পরগণার নামকরণ হয়েছিল।

পরবর্তীকালে আতুয়াজান পরগণা থেকে কিসমত আতুয়াজান, সিক সোনাইতা, হাওলি সোনাইতা ও দুলালী—এই চারটি পরগণার বিকাশ ঘটে। পরে লক্ষ্মণছিরি, মাহারাম, বেতাল, সিংচাপড়, কুবাজপুর ও লাউড়-সহ আরও বহু পরগণার উদ্ভব হয়।

এসব তথ্য থেকে ধারণা করা যায়, দাওরাই অঞ্চল একসময় বৃহত্তর প্রশাসনিক বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।

পরগণা ব্যবস্থার বিবর্তন

ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুলতানি আমলে কয়েকটি গ্রামকে কেন্দ্র করেই পরগণা ব্যবস্থার সূচনা হয়। পরে শেরশাহ সূরি শিকদার, আমিন ও কারকুন পদ সংযোজনের মাধ্যমে এই প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও সুসংগঠিত করেন।

পরবর্তীকালে সম্রাট আকবরের রাজস্বমন্ত্রী রাজা টোডরমল ১৫৮২ সালে সরকার, পরগণা ও মহলভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থাকে সুপরিকল্পিত রূপ দেন।

দাওরাইয়ের ইতিহাসে এই প্রশাসনিক বিবর্তনের সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। ফলে আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও রাজস্ব কাঠামোর বিকাশেও এ অঞ্চলের গুরুত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য।

প্রাচীন মানচিত্রে দাওরাইয়ের অবস্থান

দাওরাইয়ের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় মানচিত্র বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাচীন বাংলার মানচিত্রে শ্রীহট্টের দক্ষিণ-পশ্চিমে মধুপুর জঙ্গল, আসফপুর, সুবর্ণগ্রাম ও বিক্রমপুরের উল্লেখ থাকলেও বর্তমান সুনামগঞ্জ বা লাউড়-এর নাম পাওয়া যায় না।

অন্যদিকে মধ্যযুগীয় সুলতানি আমলের মানচিত্রে শ্রীহট্টের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে লাউড়সুসাঙ্গ-এর নাম স্পষ্টভাবে উঠে এলেও তখনও সুনামগঞ্জের উল্লেখ অনুপস্থিত।

পরবর্তীকালে মুঘল আমলে ১৬৬০ সালের শ্রীহট্টের মানচিত্রে লাউড়, সুনামগঞ্জ, জয়ন্তিয়া, বানিয়াচং, জগন্নাথপুর, তরফ, প্রতাপগড়, ধর্মপাশা, বংশীকুণ্ডা, বেতাল, দিরাই, কুবাজপুর ও দুলালীসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থানের নাম সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত দেখা যায়।

এই ধারাবাহিক উপস্থাপন থেকে ধারণা করা হয়, প্রাচীন দাওরাইয়ের বিস্তীর্ণ জলাভূমি অঞ্চল থেকেই পরবর্তীকালে লাউড় রাজ্যের উত্থান ঘটে এবং মুঘল আমলে আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তি গড়ে ওঠে।

দাওরাইয়ের ইতিহাস তাই কেবল একটি গ্রামের ইতিহাস নয়; এটি সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলের আধ্যাত্মিক, প্রশাসনিক ও ভূরাজনৈতিক বিবর্তনেরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

শেখ এ কে এম জাকারিয়া : গবেষক, কবি ও প্রাবন্ধিক। সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি, বংশপরম্পরা ও ভূমি-ইতিহাস নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণা সুপরিচিত।