ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

দাওরাই জনপদের ইতিহাস পর্ব–১ ।। শেখ একেএম জাকারিয়া।।

দাওরাই জনপদের ইতিহাস পর্ব–১  ।। শেখ একেএম জাকারিয়া।।

জনপদের জন্ম, নামকরণ হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)

।। শেখ একেএম জাকারিয়া ।।

সিলেট অঞ্চলের প্রাচীন জনপদগুলোর ইতিহাসে দাওরাই একটি সুপরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ নাম। এটি কেবল একটি গ্রাম বা বসতিস্থল নয়; বরং বহু শতাব্দীর ইতিহাস, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, লোকস্মৃতি এবং প্রাচীন জনবসতির এক অনন্য সাক্ষ্য।

প্রবীণদের স্মৃতিচারণ, গবেষকদের সংগৃহীত তথ্য, প্রাচীন ভূমি নথি, খতিয়ান, পরচা, ধর্মীয় স্থাপনা, মাজার এবং লোকশ্রুতি—সব মিলিয়ে দাওরাইয়ের অতীত আজও জীবন্ত। এ কারণেই সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের ইতিহাস অনুধাবনের ক্ষেত্রে দাওরাইকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই জনপদের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হলেন হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)। তাঁর আগমন, ধর্মপ্রচার এবং আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব দাওরাই অঞ্চলে জনবসতি গড়ে ওঠা ও ইসলামের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আজও তাঁর নাম ও স্মৃতি দাওরাইয়ের পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

দাওরাই নামের উৎপত্তি

দাওরাই নামের উৎপত্তি নিয়ে মূলত দুটি মত প্রচলিত রয়েছে।

প্রথম মতটি লোকশ্রুতিনির্ভর। এর মতে, হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর নামের ‘দাও’ অংশ এবং ইসলাম গ্রহণকারী এক হিন্দু সম্ভ্রান্ত নারী ‘রাই’-এর নামের শেষাংশ মিলিয়েই ‘দাওরাই’ নামের সৃষ্টি।

দ্বিতীয় মতটি গবেষণাভিত্তিক। গবেষকদের মতে, একসময় এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল জলাভূমি। উঁচু স্থানগুলো ছিল বনজঙ্গলে আচ্ছাদিত এবং এলাকাটির কোনো নির্দিষ্ট নাম বা প্রশাসনিক পরিচয় ছিল না। পরবর্তীকালে হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) এখানে বসতি স্থাপন, ধর্মপ্রচার এবং আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলে তাঁর স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই এই অঞ্চলের নাম ‘দাওরাই’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬১ সালের থাক (থ্যাক) নকশায় নামটি বিকৃত হয়ে ‘দাসরাই’ হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছিল। তবে স্থানীয় জনগণের প্রচেষ্টায় পুনরায় ‘দাওরাই’ নামটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

আফগানিস্তান থেকে সিলেটে আগমন

ঐতিহাসিক বর্ণনা ও লোকপরম্পরা অনুযায়ী, হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) ছিলেন সুদূর আফগানিস্তান থেকে আগত এক আধ্যাত্মিক সাধক। তিনি আফগান রাজসভায় কাজীর দায়িত্ব পালন করতেন।

পরবর্তীকালে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সান্নিধ্য ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে সিলেটে আগমন করেন। গৌড়গোবিন্দের পতনের পর ইসলাম প্রচারের ধারাবাহিকতায় তিনি বর্তমান জগন্নাথপুর অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেন।

রাই-এর ইসলাম গ্রহণ ও বিবাহ

লোককথা ও ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, যমুনা নদীতীরবর্তী হিন্দু পণ্ডিতদের একটি ধর্মসভায় হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত এবং ইসলামের বাণী তুলে ধরেন।

তাঁর বক্তব্যে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘রাই’ নামের এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু যুবতী ইসলাম গ্রহণ করেন।

পরবর্তীকালে তিনি হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর কাছে বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। স্থানীয় লোকবিশ্বাসে এই ঘটনাকে দাওরাই জনপদের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

দাওরাই টিলার প্রতিষ্ঠা

বর্ণিত আছে, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর নির্দেশে প্রথমে তাঁরা ওই এলাকায় অস্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পরে তাঁরই নির্দেশক্রমে বর্তমান জগন্নাথপুর উপজেলার একটি টিলাসদৃশ স্থানে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলেন।

সময়ের প্রবাহে এই স্থানটি ‘দাওরাই টিলা’ নামে পরিচিতি লাভ করে এবং পরবর্তী সময়ে এটি দাওরাই জনপদের ঐতিহাসিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

মোকামের ইতিহাস

দাওরাই গ্রামের এই প্রাচীন বসতিস্থল আজও স্থানীয়ভাবে ‘মোকাম’ নামে পরিচিত।

জামার গাঁও মৌজায় অবস্থিত আলুয়া খাল নামে প্রশস্ত ও গভীর জলধারার ওপর নির্মিত বৃহৎ বাঁশের সেতু অতিক্রম করেই এই মোকামে পৌঁছাতে হয়। স্থানীয়দের মতে, ‘আলুয়া’ শব্দটি মূলত ‘হালুয়া’ শব্দের আঞ্চলিক রূপ।

বর্তমানে বেষ্টনীঘেরা এই মোকাম অনেকটাই জরাজীর্ণ। চারপাশে ভাঙাচোরা প্রাচীর, প্রাচীন বৃক্ষরাজি, দুটি আমগাছ, একটি লেবুগাছ, দুটি কাঁঠালগাছ এবং বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘আম্বল তাজ বৃক্ষ’ এখনও অতীতের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

গবেষক এ এস এম ওয়াজেদ-এর মতে, এই বৃক্ষটি কয়েক শতাব্দী ধরে মৃতপ্রায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। একদিকে এর ভেষজ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, অন্যদিকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবেও বিবেচিত।

মোকামের সম্মুখভাগে আজও হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর নাম উৎকীর্ণ কিছু অস্পষ্ট বাংলা লিপি দেখা যায়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এসব নিদর্শনই দাওরাইয়ের ইতিহাস ও হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করছে। (চলবে)

তথ্যসূত্র: রহমতপুরের ইতিবৃত্ত

শেখ এ কে এম জাকারিয়া : গবেষক, কবি ও প্রাবন্ধিক। সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি, বংশপরম্পরা ও ভূমি-ইতিহাস নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণা সুপরিচিত।