ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

অসহায় প্রতিবন্ধী ভিক্ষুকের টাকা ছিনিয়ে হত্যা, কোথায় হারাল মানবিকতা?

অসহায় প্রতিবন্ধী ভিক্ষুকের টাকা ছিনিয়ে হত্যা, কোথায় হারাল মানবিকতা?

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ৪ আগস্ট:

মানুষের কাছে হাত পেতে পাওয়া সামান্য অর্থই ছিল তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে থামাতে পারেনি। হুইলচেয়ারে বসে প্রতিদিন বের হতেন জীবিকার সন্ধানে। তাড়াইল সিএনজি স্টেশনে ভিক্ষা করে যে টাকা পেতেন, তা দিয়েই চলতো তার জীবন। কিন্তু সেই সামান্য জমানো টাকার জন্যই শেষ পর্যন্ত প্রাণ দিতে হলো তাকে।

কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার বরুহা রাজঘাট গ্রামের হাবুল মিয়া (৫২) আর কোনোদিন তার হুইলচেয়ার নিয়ে রাস্তায় বের হবেন না। আর কোনোদিন মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন জানাবেন না। দুর্বৃত্তদের নির্মম আঘাতে থেমে গেছে তার জীবনের পথচলা।

হাবুল মিয়া ছিলেন শারীরিক ও বাকপ্রতিবন্ধী। মৃত মন্নাছ মিয়ার এই সন্তান দীর্ঘদিন ধরে হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতেন। নিজের অসহায়ত্বকে মেনে নিয়েও কারও বোঝা না হয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিলেন। ভিক্ষা করেই নিজের জীবন চালাতেন তিনি।

কিন্তু রোববার দিবাগত রাত তার জীবনের শেষ রাত হয়ে আসে। রাত আনুমানিক পৌনে ৩টার দিকে নিজ বাড়ির সামনের কাঁচা রাস্তায় অবস্থানকালে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তার ওপর হামলা চালায়। অভিযোগ, গাছের কাঠ দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। গুরুতর রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে যান হাবুল।

বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় সাহায্যের জন্য চিৎকার করতেও পারেননি তিনি। শুধু তার গোঙানির শব্দ শুনে আশপাশের মানুষ ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করেন। এ সময় দুর্বৃত্তরা তার সঙ্গে থাকা টাকা-পয়সা নিয়ে পালিয়ে যায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার দুপুর ২টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হাবুল মিয়া।

একজন অসহায় প্রতিবন্ধী মানুষের কাছ থেকে ভিক্ষা করে জমানো টাকা ছিনিয়ে নিতে এমন নৃশংস হামলার ঘটনায় এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একই সঙ্গে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, হাবুল মিয়া কারও ক্ষতি করেননি। নিজের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে তিনি বেঁচে ছিলেন। তার কাছে থাকা সামান্য অর্থের জন্য একজন মানুষকে এভাবে হত্যা করা সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।

হাবুল মিয়ার স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে ঢাকায় বসবাস করেন। পরিবারের স্বজনরা এখন শুধু হারানোর বেদনা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

এ ঘটনায় সোমবার সকালে নিহতের খালাতো ভাই আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে তাড়াইল থানায় মামলা করেন। মামলায় ২ থেকে ৩ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি দণ্ডবিধির ৩৯৪ ধারায় রুজু করা হয়েছে।

তাড়াইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ আবু সালেহ মাসুদ করিম জানান, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের অভিযান চলছে।

হাবুল মিয়ার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়, এটি সমাজের সামনে রেখে গেছে এক কঠিন প্রশ্ন—যে সমাজে একজন প্রতিবন্ধী মানুষের ভিক্ষার টাকাও নিরাপদ নয়, সেখানে মানবিকতা আজ কোথায় দাঁড়িয়ে?