কবিতার এক যুগের অবসান

না ফেরার দেশে মৃত্তিকার কবি আল মুজাহিদী

না ফেরার দেশে মৃত্তিকার কবি আল মুজাহিদী

সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর:

বাংলা সাহিত্যাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের বিদায়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশজুড়ে। একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি, গবেষক, সম্পাদক ও সাহিত্য-সংগঠক আল মুজাহিদী আর নেই। শুক্রবার (১৯ জুন) দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এই বরেণ্য সাহিত্যিক। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। হৃদ্‌রোগ, কিডনি জটিলতা এবং বয়সজনিত নানা সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছিলেন তিনি। কয়েক দফা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি স্থায়ী হয়নি।

কবির ছেলে শাবিব আল মুজাহিদী জানান, বুধবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় একাধিকবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হন তিনি। শুক্রবার দুপুরে আবারও হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসকরা জরুরি চিকিৎসা ও শক থেরাপি প্রয়োগ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, গত দুই বছর ধরে তিনি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে ছিলেন। হৃদযন্ত্রে দুইবার রিং পরানো হয়েছিল। গত বছর চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর শারীরিক দুর্বলতা আরও বেড়ে যায়। পরে কিডনির জটিলতাও দেখা দেয়। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তাঁকে একাধিক হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। শেষদিকে তাঁর হৃদযন্ত্র, কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে তাঁকে লাইফ সাপোর্টেও রাখা হয়েছিল।

শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাঁকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হবে।

টাঙ্গাইলের গ্রাম থেকে বাংলা সাহিত্যের আকাশে

আল মুজাহিদীর জন্ম ১৯৪৩ সালে টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার নারুচি গ্রামে। সাহিত্য ও সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠেন তিনি। তাঁর বাবা আবদুল হালিম জামালী ছিলেন নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। মা সাখিনা খানও ছিলেন গীতিকার ও সমাজসেবক।

শৈশব থেকেই সাহিত্যচর্চার প্রতি গভীর আকর্ষণ ছিল তাঁর। টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পৃথকভাবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

ষাটের দশকের শক্তিশালী কবিকণ্ঠ

বাংলা কবিতার ইতিহাসে ষাটের দশক ছিল পরিবর্তনের সময়। সেই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন আল মুজাহিদী। তাঁর কবিতায় যেমন ছিল মাটির গন্ধ, তেমনি ছিল বিশ্বমানবতার আহ্বান। গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি, প্রেম, ইতিহাস, জাতীয়তাবোধ, যুদ্ধবিরোধী চেতনা এবং মানুষের অন্তর্জগত ছিল তাঁর কবিতার প্রধান বিষয়।

সমালোচকদের মতে, আধুনিক কাব্যভাষা ও লোকজ ঐতিহ্যের সফল সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন তিনি। ফলে তাঁর কবিতা একইসঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাধারণ পাঠকের কাছেও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

অর্ধশতাধিক গ্রন্থের স্রষ্টা

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, গবেষণা ও অনুবাদ সাহিত্যে সমান দক্ষতার পরিচয় দেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক।

উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘হেমলকের পেয়ালা’, ‘ধ্রুপদ ও টেরাকোটা’, ‘মৃত্তিকা অতিমৃত্তিকা’, ‘সমুদ্র মেখলা’, ‘কালের বন্দিশে’, ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’, ‘প্রাচ্য পৃথিবী’ এবং ‘সন্ধ্যার বৃষ্টি’।

শুধু মৌলিক সাহিত্যই নয়, তিনি বিদেশি সাহিত্য অনুবাদের মাধ্যমেও বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। কাইফি আজমি, আহমদ ফরাজ ও হাইনরিশ হাইনের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কবিদের রচনাও তিনি বাংলায় অনুবাদ করেন।

সাংবাদিকতা ও সম্পাদনায় অনন্য অবদান

সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাংবাদিকতাতেও ছিল তাঁর দীর্ঘ পথচলা। তিন দশকের বেশি সময় দেশের অন্যতম প্রাচীন সংবাদপত্র দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর হাত ধরে অসংখ্য তরুণ কবি ও লেখক সাহিত্যজগতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার সুযোগ পেয়েছেন।

পরবর্তীতে বিভিন্ন সাহিত্য সাময়িকী ও পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি সাহিত্যপত্র ‘নতুন এক মাত্রা’র সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মাননা

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৩ সালে তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। এছাড়া তিনি জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার, কবি জসীমউদ্দীন একাডেমি পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার, শেরে বাংলা সংসদ পুরস্কার এবং জয়বাংলা সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা লাভ করেন।

রেখে গেলেন এক বিশাল উত্তরাধিকার

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী পলিন পারভীন, ছেলে শাবিব আল মুজাহিদী, মেয়ে মারিয়ামা জাবীন আল মুজাহিদী, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।

কবি আল মুজাহিদীর প্রস্থান শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; এটি বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি। তবে তাঁর কবিতা, চিন্তা ও সাহিত্যকর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বেঁচে থাকবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য যতদিন থাকবে, আল মুজাহিদীর নামও ততদিন উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধার সঙ্গে।