ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প । । ৮ ।। দেখিস, একদিন আমরাও...। ।
।। দেখিস, একদিন আমরাও...।।
।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর।।
উৎসর্গ
“চর ইছামতির সেই সব স্বপ্নবাজ তরুণদের উদ্দেশে, যারা অন্ধকারেও আলো খুঁজে নেয়।”
আষাঢ়ের আকাশটা যেন এই গ্রামের মনের মতোই অস্থির। কখনো ঝলমলে রোদ, আবার পরক্ষণেই কালো মেঘে ঢেকে যায় পুরো আকাশ। টিপটিপ করে বৃষ্টি নামে, তারপর হঠাৎই ঝড়ের মতো হাওয়ায় দুলে ওঠে বাঁশঝাড়। বিদ্যুৎ আসে, যায়—এটা যেন এই গ্রামের নিত্যদিনের নিয়ম।
গ্রামের নাম চর ইছামতি।
নদীর বাঁকে ঘেরা ছোট্ট এই গ্রামটা যেন পৃথিবীর সবকিছু থেকে একটু আলাদা। এখানে রাত মানে অন্ধকার আর নীরবতা নয়—রাত মানে উত্তেজনা, অপেক্ষা, আর ছোট ছোট দলবেঁধে মানুষের গল্প শোনার ভিড়।
কারণ এখানে এখন বিশ্বকাপ চলছে।
কিন্তু কারও ঘরে টিভি স্থির থাকে না।
কারও বাড়িতে বিদ্যুৎ আসে, তো পরক্ষণেই চলে যায়। কোথাও আবার ঝড়ের কারণে পুরো গ্রাম অন্ধকারে ডুবে যায়। কেউ কেউ তো বিশ্বকাপের একটি বলও চোখে দেখতে পারে না।
তবু খেলা থেমে থাকে না।
খেলা চলে মানুষের মুখে মুখে।
চায়ের দোকান, মুদি দোকান, মসজিদের বারান্দা—সব জায়গা একেকটা ছোট্ট স্টেডিয়াম হয়ে ওঠে।

রাতে যখন পাশের বাজারে বিদ্যুৎ থাকে, তখন কয়েকজন তরুণ গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে দোকানের জানালার পাশে। টিভির ছোট স্ক্রিনে ফুটে ওঠে বিশ্বকাপের ছবি। কেউ দেখে, কেউ দেখে না—কিন্তু সবাই শোনে।
আর তারপর তারা ছুটে আসে গ্রামে।
—“আর্জেন্টিনা গোল দিয়েছে!”
—“না না, ব্রাজিল এগিয়ে গেছে!”
এই খবরগুলো যেন বাতাসের আগে গ্রামে পৌঁছে যায়।
চর ইছামতির এক কোণে থাকে রায়হান। বয়স ষোলো। চোখে অদ্ভুত এক আগুন। তার পায়ে একটা পুরোনো ফুটবল, যেটার চামড়া উঠে গেছে বহু জায়গায়।
রায়হান জানালার পাশে বসে থাকে। টিভি দেখতে পায় না, কিন্তু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করে—
সবুজ মাঠ, বিশাল স্টেডিয়াম, হাজার হাজার মানুষ, আর লাল-সবুজ পতাকা উড়ছে কোথাও।
তার পাশে বসে আছে তার দাদু হাসেম আলী।
দাদু লাঠিতে ভর দিয়ে বসে থাকেন। মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকান। যেন তিনি সময়কে মাপতে চান।
রায়হান জিজ্ঞেস করে,
—দাদু, আমরা কেন বিশ্বকাপ দেখি না?
দাদু একটু হেসে বলেন,
—দেখি তো। আমরা শুনে দেখি।
—শুনে আবার খেলা দেখা যায় নাকি?
দাদু ধীরে ধীরে বলেন,
—যে খেলা স্বপ্নের, সেটা চোখে না দেখলেও হৃদয়ে দেখা যায়।
রায়হান চুপ হয়ে যায়।
বাইরে ঝড় বাড়ে। টিনের চাল কেঁপে ওঠে। বিদ্যুৎ চলে যায়।
পুরো গ্রাম অন্ধকারে ডুবে যায়।
কিন্তু অন্ধকারেও মানুষ থামে না।
কারণ কেউ একজন চিৎকার করে বলে—
—“ইতালি আবার সুযোগ মিস করলো!”
আর সেই চিৎকারে পুরো গ্রাম যেন আবার জীবিত হয়ে ওঠে।
রায়হান দৌড়ে বাইরে আসে। কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে। আকাশের দিকে তাকায়।
তার বুকের ভেতর একটাই কথা ঘুরে—
“আমি একদিন এই মাঠেই খেলবো, যেখানকার খেলা পুরো বিশ্ব দেখবে।”
দাদু ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়ান।
—কি দেখছিস?
রায়হান আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,
—স্টেডিয়াম।
দাদু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর খুব আস্তে রায়হানের কাঁধ ধরে বলেন,
—দেখিস, একদিন আমরাও সেই মাঠে খেলবো, যেখানে আলো কখনো যায় না।
রায়হান তাকায়।
দাদুর চোখে তখন কোনো বাস্তবতা নেই—শুধু বিশ্বাস।
বৃষ্টি থেমে যায়।
দূরে কোনো বাড়িতে হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠে।
আর সেই আলোয় রায়হানের মুখটা স্পষ্ট হয়—যেন একটা অর্ধসমাপ্ত ইতিহাস।
রাত গভীর হয়।
গ্রামের মানুষ আবার চায়ের দোকানে জড়ো হয়।
কেউ হেসে বলে, কেউ চিৎকার করে, কেউ আবার কেবল শোনে।
কিন্তু সবার বুকেই একই স্বপ্ন—
একদিন যদি তাদের দেশও খেলতে পারে সেই বড় মাঠে, যেটা তারা শুধু শব্দে দেখে এসেছে।
রায়হান বলটা আবার লাথি মারে।
বলটা অন্ধকারে হারিয়ে যায় না।
সে যেন দূরে কোথাও আলো খুঁজে নেয়।
বছরগুলো যেন হঠাৎ বদলে যায় না, ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।
একদিন হয়তো কোনো বড় স্টেডিয়ামে লাল-সবুজ জার্সি পরে দাঁড়াবে একদল ছেলে। ক্যামেরা তাদের দিকে তাকিয়ে থাকবে।
সেদিন ধারাভাষ্যকার বলবে—
“বাংলাদেশ, তাদের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলছে।”
আর সেই মুহূর্তে কোথাও না কোথাও কোন এক বৃদ্ধ দাদু মনে মনে বলবেন,
—দেখিস, আমি বলেছিলাম না… একদিন আমরাও পারবো।
স্বপ্নের জন্য সবসময় আলো লাগে না। কখনো কখনো অন্ধকার, ঝড়, আর সীমাবদ্ধতার ভেতরেই সবচেয়ে বড় স্বপ্ন জন্ম নেয়। যে জাতি শুনে শুনে স্বপ্ন দেখে, একদিন সে জাতি নিজেই ইতিহাস হয়ে উঠতে পারে।
লন্ডন, ২২ জুন ২০২৬