শান্তি নাকি ঘোষণা–বিভ্রান্তি: ইরান চুক্তির দ্বারপ্রান্তে ট্রাম্পের দাবি, তেহরানের অস্বীকৃতি

শান্তি নাকি ঘোষণা–বিভ্রান্তি: ইরান চুক্তির দ্বারপ্রান্তে ট্রাম্পের দাবি, তেহরানের অস্বীকৃতি

ভয়েস অব পিপল ডেস্ক, ৩০ মে: 

ওয়াশিংটন–তেহরান উত্তেজনার নতুন অধ্যায়ে আবারও অনিশ্চয়তার মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে একটি বড় ধরনের শান্তিচুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে একই সময়ে তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন—কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো হয়নি।

দুই পক্ষের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান শুধু কূটনৈতিক বিভ্রান্তিই তৈরি করেনি, বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

হোয়াইট হাউসের ভেতর টানটান বৈঠক

শুক্রবার দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে সিচুয়েশন রুমে শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। বৈঠক শেষে তিনি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেননি। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র “কেবল এমন চুক্তিই করবে যা আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করে এবং তাদের নির্ধারিত সীমারেখা পূরণ করে।”

ট্রাম্প নিজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, সম্ভাব্য চুক্তিতে ইরানকে অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্রের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে, এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ Strait of Hormuz-কে কোনো বাধা বা টোল ছাড়া সব জাহাজের জন্য খুলে দিতে হবে।

ইরানের কড়া অবস্থান

তবে তেহরান এই দাবিগুলোকে সরাসরি চুক্তি হিসেবে মানতে নারাজ। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, “কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি, আলোচনা চলছে মাত্র।”

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আগারচি আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনার কথা স্বীকার করলেও স্পষ্ট করেছেন যে, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয়—এমন কোনো শর্ত তারা মেনে নেবেন না।

রাষ্ট্রীয় ও আধা-রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো ট্রাম্পের ঘোষণাকে “একতরফা” এবং “আংশিক তথ্যভিত্তিক” বলে আখ্যা দিয়েছে।

কূটনীতির আড়ালে শক্তির রাজনীতি

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু একটি চুক্তির আলোচনা নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন লড়াইয়ের ইঙ্গিত।

ইরানের পার্লামেন্টের একাধিক সদস্য দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালী তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও তারা অবস্থান পরিবর্তন করবে না।

অন্যদিকে ওয়াশিংটন বলছে, ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে—যা তেহরান বহুদিন ধরে “অগ্রহণযোগ্য” বলে আসছে।

ইসরায়েল ও আঞ্চলিক সমীকরণ

এই আলোচনার বাইরে থেকেও পরিস্থিতি জটিল করছে ইসরায়েলের সামরিক অবস্থান। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু লেবানন ও হিজবুল্লাহ ঘিরে সামরিক চাপ বাড়িয়ে চলেছেন, যা পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।

ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কও রুবিও এবং উপ-রাষ্ট্রপতি ডেডি ভান্স এর ইঙ্গিত অনুযায়ী, চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছানো গেলেও শেষ সিদ্ধান্ত এখনো ঝুলে আছে।

আস্থার সংকটেই আটকে আলোচনা

ইরানের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় আপত্তি হলো আস্থার অভাব। তেহরান বলছে, “কথা নয়, কাজই আসল”—এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর অতীত অভিজ্ঞতা তাদের আরও সতর্ক করে তুলেছে।

এই অবস্থায় চুক্তি যদি হয়ও, তা হবে দীর্ঘ ও জটিল এক প্রক্রিয়ার শুরু মাত্র—সমাপ্তি নয়।

অনিশ্চয়তার কূটনীতি

বর্তমান পরিস্থিতি একদিকে ট্রাম্পের “ডিল-মেকিং” কৌশলের পরীক্ষা, অন্যদিকে ইরানের রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রদর্শন। কিন্তু এই টানাপোড়েনের মাঝে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা থেকে যাচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা।

চুক্তি হবে কি হবে না—তার চেয়েও বড় প্রশ্ন এখন একটাই: এই অনিশ্চয়তা আর কতদূর গড়াবে?