ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১১০ ।। ছেড়ে দে বাবা, কেঁদে বাঁচি : হরমুজ তোরে দিয়া দিছি
উৎসর্গ
বিশ্বরাজনীতির এই দাবা খেলায় বারবার বলি হওয়া সেই সাধারণ মানুষদের—যাদের জীবনে তেলের দাম বাড়ে, কিন্তু ক্ষমতার দাম কখনো কমে না।

বিশ্বরাজনীতির আজকের দৃশ্যটা একটু দূর থেকে দেখলে মনে হয়—এটা কোনো কূটনৈতিক সংকট না, বরং এক ধরনের রিয়েলিটি শো। যেখানে নিয়ম নেই, স্ক্রিপ্ট নেই, আছে শুধু তাৎক্ষণিক সংলাপ আর অদ্ভুত সব সিদ্ধান্ত।
কয়েক সপ্তাহ আগেও ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন ভঙ্গিতে যুদ্ধের ঘোষণা দিচ্ছিলেন, যেন এটা তার ব্যক্তিগত প্রজেক্ট—“চার থেকে ছয় সপ্তাহে শেষ!”
যুদ্ধ যেন কোনো নির্মাণকাজ, আর তিনি তার কন্ট্রাক্টর।
কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম।
ছয় সপ্তাহ পার হতে না হতেই দৃশ্য পাল্টে গেছে।
এখন আর বোমা, মিসাইল, “শক অ্যান্ড অ’”—এসব শব্দ শোনা যাচ্ছে না।
এখন শোনা যাচ্ছে—
“আমাকে তাড়াহুড়া করিও না…”
আর তারও একটু পর—
“তারা যদি কথা বলতে চায়, ফোন করলেই হবে!”
এই এক বাক্যে আধুনিক কূটনীতির সারসংক্ষেপ শেষ।
আগে রাষ্ট্রদূত যেত, বৈঠক হতো, মধ্যস্থতাকারী থাকত।
এখন?
একটা ফোন কল!
মজার ব্যাপার হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল পাকিস্তানে গিয়ে ইরান নিয়ে আলোচনা করবে—এই পরিকল্পনাটাও বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। কারণ—সময় নষ্ট হবে!
অর্থাৎ, যুদ্ধের জন্য সময় আছে, কিন্তু আলোচনার জন্য নেই।
অন্যদিকে আব্বাস আরাঘচি ইতোমধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—ইরান তাদের অবস্থান দিয়েছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আদৌ সিরিয়াস কিনা, সেটা তারা বুঝতে পারছে না।
এখানেই আসল কৌতুক।
একপক্ষ বলছে—“ওরা কথা বলতে চায়।”
অন্যপক্ষ বলছে—“আমরা তো কোনো বৈঠকের কথাই বলিনি!”
এ যেন একতরফা প্রেমের গল্প—
একজন ইতোমধ্যে বিয়ের কার্ড ছাপিয়ে ফেলেছে,
অন্যজন এখনো নামটাই ঠিক করে উঠতে পারেনি।
এই পুরো নাটকের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে হরমুজ প্রণালী—
একটা সরু জলপথ, কিন্তু শক্তিতে এক মহাদেশের সমান।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ দিয়ে যায়।
আর এখন সেই পথ আংশিক বন্ধ।
ইরান সেটাকে ব্যবহার করছে সবচেয়ে শক্তিশালী দর-কষাকষির অস্ত্র হিসেবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে নৌবাহিনী বাড়িয়ে বলছে—
“আমাদের সব কার্ড আছে!”
শুনলে মনে হয়, তারা ‘পোকার’ খেলছে।
কিন্তু সমস্যা হলো—এই খেলায় হারলে শুধু পয়েন্ট যায় না, পুরো বিশ্ব অর্থনীতি কেঁপে ওঠে।
তেলের দাম বাড়ে, ফ্লাইট বাতিল হয়, বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।
আর তখন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে—এই “কার্ড খেলা” আসলে তাদের জীবন নিয়েই খেলা।
আরও মজার কথা—যখন ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করা হলো, এই সফর বাতিল মানে কি আবার যুদ্ধ শুরু হবে?
তিনি বললেন—
“না… আমরা এখনো সেটা ভাবিনি!”
ভাবেননি?
যুদ্ধ শুরু করার সময় ভাবেননি,
কৌশল বদলানোর সময় ভাবেননি,
এখন আবার বলছেন—“ভাবিনি!”
এ যেন কেউ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মাঝপথে এসে বলছে—
“আসলে আমি সাঁতার জানি কিনা, সেটা এখনো ভাবিনি!”
এদিকে মাসুদ পেজেশকিয়ান বলছেন—
ইরান আলোচনায় আগ্রহী, কিন্তু শর্ত আছে—অবরোধ, হুমকি আর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ বন্ধ করতে হবে।
অর্থাৎ, একপক্ষ বলছে—
“চাপ সরাও, তারপর কথা বলি।”
আরেকপক্ষ বলছে—
“চাপ থাকবে, তুমি শুধু ফোন করো!”
এই দ্বন্দ্বটাই আজকের বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজিকমেডি।
একসময় যুদ্ধের আগে কূটনীতি হতো।
এখন যুদ্ধ হয় আগে, কূটনীতি আসে পরে—তাও যদি আসে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা কিন্তু থেকে যায়—
এই পুরো নাটকে জিতছে কে?
যুক্তরাষ্ট্র?
ইরান?
না কি সেই সাধারণ মানুষ, যার জীবনে তেলের দাম বাড়ে, অনিশ্চয়তা বাড়ে?
সত্যি বলতে, এখানে কেউ জিতছে না।
শুধু অহংকার আর অদূরদর্শিতা একসঙ্গে মিলে এক অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি করছে।
যেখানে শুরুটা ছিল গর্জন দিয়ে—
আর শেষটা এসে দাঁড়িয়েছে অনুনয়ে।
হরমুজ প্রণালীর দিকে তাকিয়ে আজকের বিশ্ব যেন একটাই সংলাপ শুনছে—
“তুই থাক, আমি যাই… শুধু পথটা খুলে দে।”
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬