ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১০৮ ।। দেশে লোডশেডিং এর যন্ত্রনায় : মানুষের প্রান যায় যায়

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১০৮ ।। দেশে লোডশেডিং এর যন্ত্রনায় : মানুষের প্রান যায় যায়

উৎসর্গ

দেশের সেই সব সাধারণ মানুষকে,
যাঁদের জীবন প্রতিদিন বিদ্যুতের অভাবে থমকে যায়, তবুও তারা থামে না।

বাংলাদেশের গ্রীষ্ম মানেই একসময় ছিল খরদাহ, ঘাম আর কষ্টের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার এক স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু এখন সেই গ্রীষ্ম যেন এক নতুন আতঙ্কের নাম—লোডশেডিং। গরমের তাপে যখন মানুষের শরীর জ্বলে ওঠে, তখন বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা যেন সেই যন্ত্রণাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে এমন—মানুষ শুধু গরমে নয়, বিদ্যুতের অনিশ্চয়তায়ও দমবন্ধ হয়ে বেঁচে আছে।

জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় লোডশেডিং আরও বাড়বে বলে আভাস দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। উৎপাদন সক্ষম বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও প্রয়োজনীয় গ্যাস, কয়লা ও এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ ঘাটতি আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন থেকে খোদ ঢাকা শহরে লোডশেডিং হবে।

সিলেটেও সারা দেশের মতো ইদানিং শুরু হয়েছে বিদ্যুতের অসহনীয় লোডশেডিং। একদিকে প্রচন্ড রোদে বেড়েছে গরম, তার ওপর শুরু হয়েছে বিদ্যুতের ভেলকিবাজি। প্রতি ঘণ্টায় লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি। গ্রামাঞ্চলে এ অবস্থা আরো ভয়াবহ। এ নিয়ে গ্রাহকদের মাঝে বিরাজ করছে ক্ষোভ।

মনে পড়ে তরুণবেলার কথা। তখনও ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যেতো। তার উপর সহ্য করতে হতো প্রচন্ড গরম। বিটিভিতে হুমায়ুন আহমেদ এর কোন নাটক বা হানিফ সংকেত এর ইত্যাদি অথবা কোন ধারাবাহিক নাটকের আগে বিদ্যুৎ চলে গেলে সবাই ভীষন রুষ্ট হতাম। তখন আমরা অতিষ্ট হয়ে পাড়ার কয়েকজন ছেলেরা হেঁটে হেঁটে চলে যেতাম আম্বরখানার ইলেকট্রিক সাপ্লাই অফিসে। ওখানে ঢুকেই শুরু হতো আমাদের চিল্লাচ্চিলি। কখন দেবেন কারেন্ট? কেন এতক্ষণ বন্ধ করে লোড শেডিং করছেন, এই অনুষ্ঠানের সময় কেন কারেন্ট নিলেন- ইত্যাদি নানা প্রশ্নবানে কর্মচারদের অতিষ্ট করে তুলতাম।

তখন বেশিরভাগ সময়েই কিছুক্ষনের জন্য ওরা বিদ্যৎ সংযোগ দিয়ে দিতো। ওরা ‘স্থানীয় পোলাপান’ হিসাবে আমাদের তেমন চটাতে চাইতো না। আর তখন ইলেকট্রিক সাপ্লাই এলাকায় তো বটেই, পুরো সিলেট শহরের এমন কোন পাড়া বা মহল্লা ছিল না যে, দু-চার ক্লাশমেট বা বন্ধু-বান্ধব ছিল না। সুতরাং আমাদের ক্ষেপালে পরে তো কিছুটা ঝামেলা হতেই পারে। এভাবে বিদ্যুৎ আসতো তারুণ্যের জোরে। অবশ্য এক বা দেড় ঘন্টার টিভি অনুষ্ঠান প্রচার শেষ হলে অনেক সময় আবার বিদ্যুৎ চলে যেতো। তবুও আমরা খুশি হতাম।

আমাদের ঐ দলের মধ্যে যাদের কথা মনে পড়ছে তারা হলো-  সেলিম,  এনাম, রমজান, মরা বাচ্চু (খুব হালকা পাতলা ছিল বলে দুষ্টু লোকেরা এই নামে ডাকতো), জিন্দা বাচ্চু, ময়না, মোতালেব ভাই, নবী ভাই। এছাড়াও আরও কয়েকজন ছিল। আজ এদের কেউ বিদেশে, কেউ দেশে আবার কেউ পরপারে। ওদের সবার কথা ভাবলে নষ্টালজিয়ায় ভুগি। ইচ্ছা আছে, ভবিষ্যতে দেশে গেলে প্রতি পাড়া থেকে দু-চারজন করে বন্ধু-বান্ধবদের খুঁজে বের করে একটা স্মৃতিময় আড্ডার ব্যবস্থা করার। 

এভাবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই, প্রায় প্রতিদিন, সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হতো তখনও। এখন নিশ্চয়ই আরো বেড়েছে এসব ঝামেলা। মূলত এসব দূর্বিসহ জীবন থেকে পলায়ন করার জন্যই মূলত বিদেশে চলে আসা। কিন্তু যাঁরা রয়ে গেছেন, তাঁরা তো দেখছি এখনও এসব ঝামেলা থেকে মুক্তি পাননি। তবে মাঝে গত দশ/পনেরো বছর বেশ ভালই ছিল বিদ্যুৎ। এভাবে হঠাৎ চলে যেতো না।

এখন তো শুনছি, টিভিতে সরাসরি দেখছি এবং পত্রিকায় নিয়মিত পড়ছি- ইদানিং ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যায়, আবার আসে। কোনো কোনো দিন ১০ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না কোন কোন এলাকায়। শিশু, বৃদ্ধ—সবাই এক ধরনের অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এটিই এখন দেশের হাজারো গ্রাম ও শহরের বাস্তব চিত্র। 

মোমবাতি জ্বালিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীরা

গ্রীষ্ম যত তীব্র হচ্ছে, বিদ্যুতের চাহিদা তত বাড়ছে। ফ্যান, এসি, সেচ পাম্প—সব মিলিয়ে চাহিদা এক লাফে বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু উৎপাদন সেই হারে বাড়ছে না। ফলে প্রতিদিনই ২ হাজার থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণ করার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে লোডশেডিং।

এখানে প্রশ্ন হলো—যে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি, সেখানে কেন এই ঘাটতি?
উত্তরটা সহজ, কিন্তু অস্বস্তিকর—জ্বালানি সংকট।

গ্যাসের ঘাটতি ভয়াবহ। যে পরিমাণ গ্যাস দিয়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, সেখানে অর্ধেকেরও কম উৎপাদন হচ্ছে। অন্যদিকে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়বহুল হওয়ায় তা কমানো হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমদানিনির্ভর বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা—বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ থাকলেই সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বৈশ্বিক প্রভাব। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, জ্বালানির বাজারে চাপ—সবকিছু মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাত এখন এক জটিল সংকটের মধ্যে। ফলে এটি আর শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক বাস্তবতার অংশ।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই সংকটের বোঝা কে বহন করছে?
উত্তর একটাই—সাধারণ মানুষ।

গ্রামের কৃষক সেচের জন্য বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না, শহরের শ্রমজীবী মানুষ কাজের মাঝখানে বিদ্যুৎ হারাচ্ছেন, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারছে না। হাসপাতাল, ছোট ব্যবসা—সবখানেই এর প্রভাব। এমনকি রাজধানীতে লোডশেডিং চালু করার সিদ্ধান্তও এসেছে, যাতে গ্রামে সেচ ব্যবস্থা সচল রাখা যায়। এটি এক ধরনের “ব্যালান্সিং অ্যাক্ট”, কিন্তু বাস্তবে এটি কষ্টের সমান বণ্টন ছাড়া আর কিছু নয়।

এই অবস্থায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দেখা যাচ্ছে। সরকার ও বিরোধী দল মিলে একটি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে—এটি ইতিবাচক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কমিটি নয়, কার্যকর সিদ্ধান্ত এখন জরুরি।

কারণ বিদ্যুতের সংকট কোনো নতুন সমস্যা নয়। প্রতি বছর গ্রীষ্ম এলেই এটি সামনে আসে, আবার কিছুদিন পর চাপা পড়ে যায়। কিন্তু সমস্যার মূল—জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিকল্পনার দুর্বলতা, এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অভাব—সেগুলো থেকেই যায়।

সমাধান কী?

প্রথমত, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও তা কাজে লাগানোর বাস্তব পরিকল্পনা দরকার।
তৃতীয়ত, সুশাসন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে—যেখানে অপচয় কমবে, সঠিক বণ্টন হবে।

সবচেয়ে বড় কথা—মানুষকে কষ্ট দিয়ে কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না।

আজকের বাংলাদেশে লোডশেডিং শুধু একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং মানবিক সংকট। যখন একটি শিশু গরমে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমাতে পারে না, যখন একজন বৃদ্ধ নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট পান, তখন সেটি শুধু বিদ্যুতের অভাব নয়—এটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়।

গ্রীষ্মের এই তীব্রতায় মানুষ এখন একটাই প্রশ্ন করছে—
আর কত?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে এখনই। না হলে লোডশেডিংয়ের এই অন্ধকার শুধু ঘর নয়, মানুষের আশা-ভরসাকেও গ্রাস করবে।

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬