ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৪ ।। এক বোতল পানি
উৎসর্গ
কাঁটাতারের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সব শিশুর জন্য, যাদের তৃষ্ণার কোনো দেশ নেই
।। এক বোতল পানি ।।
।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।
ঝর

তুলি তার হাতে ধরা খালি প্লাস্টিকের বোতলটা বারবার উল্টে-পাল্টে দেখে
পঞ্চগড়ের বড়বাড়ি সীমান্ত। নাম বড়বাড়ি বলেই বোধহয় ঐ এলাকায় ইদানিং বড়ই বাড়াবাড়ি চলছে। ওপারের বড় বড় নেতারা তাদের লোকজনকে অনায়াসে ছোট ছোট দরিদ্র মানুষদের ঠেলে দিচ্ছে এপারে।
সময়টা বিকেল। প্রচন্ড রোদ পড়েছে আজকে। অন্য দিনের চেয়ে বেশি তীক্ষ্ণ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার পুশব্যাক করেছে একদল আদম সন্তানকে। জিরো লাইনের ঘাসের ওপর বসে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, তারা কোনো দেশের মানুষ নয়, কোনো মানচিত্রেরও অংশ নয়। তারা শুধু কিছু ক্লান্ত মানুষ। কিছু অসহায় বাবা-মা। আর তিনটি তৃষ্ণার্ত শিশু। খোলা আকাশের নিচে টানা দুই দিন ধরে তারা অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা করছে এমন কিছুর জন্য, যার নাম হয়তো আশ্রয়, হয়তো স্বীকৃতি, অথবা হয়তো শুধু একটু পানি।

নয় বছরের তুলি তার হাতে ধরা খালি প্লাস্টিকের বোতলটা বারবার উল্টে-পাল্টে দেখে। বোতলের ভেতরে কিছু নেই। তারপরও সে আশা ছাড়ে না। শিশুরা খুব সহজে আশা ছাড়তে জানে না। তার পাশে বসে থাকা ছোট ভাই রিফাতের ঠোঁট শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে। মায়ের কোলে থাকা শিশুটিও মাঝে মাঝে কেঁদে উঠছে। কান্নার সেই শব্দ শুনলে মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অভাব আসলে পানির নয়, মানুষের।
তুলির বাবা গহর মিয়া দূরে তাকিয়ে বসে থাকেন। তার চোখের নিচে ঘুমহীনতার কালো দাগ। মুখে ক্লান্তির ছাপ। তিনি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।
—আর একটু ধৈর্য ধর মা।
তুলি অভিমানী গলায় বলে,
—তুমি সকালেও এই কথা বলছ।
গহর মিয়া কোনো উত্তর দিতে পারেন না। কারণ সত্যিই তো তিনি সকালেও এই কথাই বলেছেন। দুপুরেও বলেছেন। এখন বিকেলেও বলছেন। কিন্তু অপেক্ষার শেষ কোথায়, তা তিনি নিজেও জানেন না।

গত রাতের কথা মনে পড়ে তার। মুষলধারে বৃষ্টি নামছিল। চারপাশ অন্ধকার। মাথার ওপর কোনো ছাউনি নেই। শিশুরা ভিজতে ভিজতে কাঁপছিল। তারপরও তারা হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি ধরছিল। রিফাত দুই হাতের তালুতে পানি জমিয়ে ছোট ভাইয়ের মুখে দিচ্ছিল। শিশুটি তখন হাসছিল। তার বয়স মাত্র আড়াই বছর। সেই হাসি দেখে গহর মিয়ার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল। কারণ তিনি জানতেন, শিশুটি বুঝতেই পারছে না যে সে বেঁচে থাকার জন্য আকাশের দিকে মুখ তুলে পানি খাচ্ছে।
আজ আকাশে বৃষ্টি নেই। সূর্যটা নির্মমভাবে মাথার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তৃষ্ণাও তাই আরও তীব্র।
রিফাত হঠাৎ বাবার হাত ধরে টানে।
—আব্বা, গলা জ্বলে।
—আর একটু অপেক্ষা কর বাবা।
—পানি কই?
প্রশ্নটা শুনে গহর মিয়া ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ছোট্ট একটি প্রশ্ন। কিন্তু এর উত্তর তার কাছে নেই।
দূরে বাংলাদেশের একটি গ্রাম দেখা যায়। কয়েকটি টিনের ঘর। কিছু গাছ। একটি মসজিদের মিনার। বিকেলের আলোয় গ্রামের শিশুরা খেলছে। তাদের হাসির শব্দ বাতাসে ভেসে আসে। তুলি চুপচাপ সেই দিকে তাকিয়ে থাকে।
—আম্মু, ওরা খেলছে কেন?
—ওদের বাড়ি আছে।
—আমাদের কি বাড়ি নেই?
মা কিছু বলেন না। শুধু মেয়েকে বুকে টেনে নেন। কখনো কখনো নীরবতাই সবচেয়ে সত্য উত্তর হয়ে দাঁড়ায়। সত্যিই তো এপার-ওপার কোন পাড়েই তো ওদের কোন নিজস্ব বাড়ি নেই।

একসময় গহর মিয়া উঠে দাঁড়ান। তার গলা শুকিয়ে গেছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। তবু তিনি সীমান্তের দিকে তাকিয়ে ডাক দেন।
—ভাই, আমার বাচ্চার জন্য একটু পানি দেন!
তার কণ্ঠস্বর বাতাসে ভেসে যায়।
—এক বোতল পানি দিলেই হবে।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর তিনি আবার বলেন,
—টাকা লাগলে টাকা দেব। শুধু বাচ্চাটার জন্য একটু পানি দেন।
কণ্ঠটা এবার ভেঙে আসে।
দূরে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে। তারা শুনতে পায়। তাদের চোখে মায়া দেখা যায়। কিন্তু তারা এগিয়ে আসে না। হয়তো পারে না। হয়তো নিয়ম তাদের আটকে রাখে। হয়তো কাঁটাতার।
গহর মিয়ার হঠাৎ মনে হয়, পৃথিবীতে কাঁটাতারের চেয়েও শক্ত জিনিস আছে। তার নাম উদাসীনতা।
সন্ধ্যা নেমে আসে। আকাশের রং ধীরে ধীরে বদলে যায়। পশ্চিম দিগন্তে লালচে আলো ছড়িয়ে পড়ে। তুলি খালি বোতলটা বুকে চেপে ধরে বসে থাকে। যেন বোতলটা কোনো খেলনা নয়, কোনো স্বপ্ন।
হঠাৎ সে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
—আব্বা, আমি যদি পাখি হতাম?
—কেন মা?
—তাহলে উড়ে গিয়ে একটা নদী থেকে পানি খেয়ে আসতাম।
গহর মিয়ার চোখ ফেঁটে কান্না বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু এতটুকু বাচ্চার সামনে তিনি কাঁদতে পারেন না। বরং কান্নার বদলে অতি কষ্টে তিনি হেসে ফেলেন। কিন্তু সেই হাসির ভেতরেই কান্না লুকিয়ে থাকে। তিনি দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নেন।

অন্ধকার আরও ঘন হতে থাকে। শিশুগুলো মায়ের গা ঘেঁষে বসে থাকে। দূরে দুই দেশের পতাকা বাতাসে উড়ছে। দুই দেশের প্রহরীরা পাহারা দিচ্ছে। দুই দেশের নিয়ম জেগে আছে।
শুধু একটি খালি বোতল পড়ে আছে একটি শিশুর বুকে।
আর সেই মুহূর্তে মনে হয়, পৃথিবীতে মানুষের পরিচয় কি সত্যিই দেশের নামে লেখা হয়, নাকি এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেওয়ার ক্ষমতায়?
লন্ডন, ১৩ জুন, ২০২৬

পাঠকের পাঠ প্রতিক্রিয়া
চমৎকার মানবিক গল্প! অথচ গল্প নয়, সত্য! কিন্তু এই নির্মমতার প্রেক্ষিত! সেতো আরো নির্মম! আরো বেদনাদায়ক সত্য!
-- গোলাম কবির: বিশিষ্ট নাট্যকার, অভিনেতা, নাট্য নির্দেশক ও সমাজকর্মি
আপনার গল্প অত্যন্ত চমৎকার এবং স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত। এটি পড়ে আমি সত্যিই উপভোগ করেছি।
মো: সদরুজ্জামান খান: কাউন্সিলার ও ডেপুটি মেয়র, বার্কিং এন্ড ডেগেনহাম বোরো
গুরুত্বপূর্ণ লেখা। ইতিহাসের পাতায় থাকবে চিরদিন।
--বাইস কাদির : বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও কবি, বাংলাদেশ