ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩ ।। নদী কথা কয়

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩ ।। নদী কথা কয়

উৎসর্গ

ধলেশ্বরীর নদী তীরের অবহেলিত জনগনকে

সকালের কুয়াশা সরে যাওয়ার আগেই ধলু শেখ নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ান। তার হাতে পুরোনো একটি জাল। জালটি এখন খুব কমই পানিতে পড়ে। নদীতে আর তেমন পানি নেই। ধলু শেখের বয়স সত্তর পেরিয়েছে। কিন্তু এখন শরীরটা বেশ মজবুতই আছে। তার এখনও মাছ ধরার সখটি যায়নি।

নদীর নাম ধলেশ্বরী। নামটা এখনও বড়। নদীটা আর বড় নেই।

পাড়ের মাটি ফেটে গেছে। মাঝখানে বালুর চর। কয়েকটি ছেলে সেখানে ক্রিকেট খেলছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় নদীর বুক নয়, শুকনো মাঠ।

ধলু শেখ দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকে।

তার পাশে এসে দাঁড়ায় নাতনি মেঘলা শেখ।

—দাদু, তুমি কি সত্যিই এই নদীতে মাছ ধরতে?

—সারারাত ধরতাম।

—এত মাছ ছিল?

—নৌকা ভর্তি হতো।

মেঘলা অবাক হয়।

সে যে নদী দেখছে, সেখানে মাছের চেয়ে পলিথিন বেশি।

এ সময় বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে নদীর পাড়ের দিকে আসতে দেখা যায় দলিল শেখকে। সে এইমাত্র ঢাকা থেকে ফিরলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ে পড়াশোনা করছে। ধলু শেখের বড় ছেলে কালু শেখের সন্তান। মেঘলার বড় ভাই।

তার হাতে খাতা। কাঁধে ব্যাগ। মোবাইলে নদীর ছবি তোলে।

সে নদী নিয়ে থিসিস করছে।

বিষয়—"উজানের পানি নিয়ন্ত্রণ ও ভাটির নদীর পরিবর্তন"।

ধলু শেখকে পা ছুঁয়ে সালাম করে জিজ্ঞেস করে,

আবারও মাছ ধরতে বেরিয়েছো দাদু?

 ধলু শেখ হাসেন। পাল্টা প্রশ্ন করেন,

—তুই আবার নদীর ছবি তুলছিস?

—হ্যাঁ দাদু।

—এই শুকনো নদীর ছবি নিয়ে কী হবে?

দলিল নদীর দিকে তাকায়।

—আজকের ছবি না রাখলে কাল কেউ বিশ্বাস করবে না, নদীটা এমন ছিল।

ধলু শেখ চুপ করে যান।

কথাটা তার বুকের ভেতর কোথাও লাগে।

দুপুরের দিকে দলিল গ্রামের কয়েকজন বৃদ্ধের সাক্ষাৎকার নেয়। এর মধ্যে মোতালেব মাস্টার একজন। দলিলের হাইস্কুলের শিক্ষক। স্যারের খুব স্বপ্ন তাঁর এই প্রিয় ছাত্রটিকে নিয়ে। দলিল শেখ স্কুলে পড়ার সময় খুব ভাল আবৃত্তি করতো। বাংলা ও ভূগোলের শিক্ষক মোতালেব স্যারের উৎসাহে দলিল আজ ঢাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করে। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে তাকে ডাকে আবৃত্তি করার জন্য। মোতালেব স্যার দলিলকে দেখে বুকে জড়িয়ে বললেন, বাবা দলিল একটা কবিতা আবৃত্তি করো। স্যারের কথা তো ফেলা যায় না, বেয়াদবি হয়। দেখা হলে স্যার এ আব্দার করবেনই-এটা তার জানা। দলিল রবীন্দ্রনাথে ‘বাঁশী’ কবিতার আবৃত্তি শুরু করে। কারণ এ কবিতার এক জায়গায় আছে:

‘ধলেশ্বরী নদী তীরে পিসীদের গ্রাম

তার দেওরের মেয়ে,

অভাগার সাথে তার বিবাহের ছিল ঠিকঠাক

লগ্ন শুভ নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল

সেই লগ্নে এসেছি পালিয়ে...

ঘরে সে এলো সে তো

মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া

পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর...

এ কবিতাটি আবৃত্তি করলেই দলিল শেখের কেন যেন তাকে কবিতার সেই ‘হরিপদ কেরানী‘র মতো মনে হয়। বিশেষ করে যখন এই ধলেশ্বরীর পারে দাঁড়িয়ে কবিতাটি আবৃত্তি করে। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন এক ধরনের হু-হু করে ওঠে কবিতার সেই হরিপদ কেরানীর জন্য।

আবৃত্তি শেষ হলে মোতালেব মাস্টার বলেন,

—আমি যখন প্রথম প্রথম তরূন বয়সে স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করি, তখন বর্ষায় এই নদী পার হতে নৌকা ছাড়া উপায় ছিল না।

—এখন?

—এখন মানুষ হেঁটে পার হওয়ার কথা ভাবে।

দলিল খাতায় লিখে রাখে।

আরেকজন কৃষক, রহমত আলী, বলেন,

—আগে বন্যা হতো, কিন্তু সেই বন্যা ছিল আশীর্বাদ। পানি নামার পর জমিতে আলাদা সার লাগত না। এখন সেচ দিতে হয়। সার দিতে হয়। খরচ বাড়ে।

দলিল মাথা নাড়ে।

এসব তথ্য সে বইয়েও পেয়েছে।

কিন্তু মানুষের মুখ থেকে শুনলে কথাগুলো অন্যরকম লাগে।

বিকেলে বাজারের চায়ের দোকানে ভিড় জমে।

টেলিভিশনে খবর চলছে।

আন্তর্জাতিক নদী নিয়ে আলোচনা।

কেউ বলছে, উজানে আরও বাঁধ হচ্ছে।

কেউ বলছে, নতুন চুক্তি দরকার।

কেউ বিরক্ত গলায় বলে,

—চুক্তির কথা তো ছোটবেলা থেকেও শুনি।

দোকানের মালিক করিম চাচা বলেন,

—নদী শুকালে শুধু জেলের ক্ষতি হয় না। কৃষকের ক্ষতি হয়। ব্যবসায়ীর ক্ষতি হয়। সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দলিল চুপচাপ শুনে।

সে জানে, দেশের অনেক নদীর নাব্যতা কমে গেছে। কোথাও লবণাক্ততা বেড়েছে। কোথাও মাছ কমেছে। কোথাও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।

তার থিসিসের খাতায় সংখ্যা আছে।

কিন্তু ধলু শেখের মুখে আছে কষ্টের ইতিহাস।

সন্ধ্যার আগে দলিল মেঘলাকে নিয়ে নদীর চরে হাঁটতে বের হয়।

পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে আছে।

মেঘলা জিজ্ঞেস করে,

—ভাইয়া, নদী কেন শুকিয়ে যায়?

দলিল কিছুক্ষণ চুপ থাকে।

তারপর বলে,

—অনেক কারণ আছে। পলি জমে। নদী ভরাট হয়। আবার কোথাও কোথাও উজানে পানি আটকে রাখা হয়। তখন নিচের দিকে কম পানি আসে।

—তাহলে নদী কি অসুস্থ হয়ে যায়?

দলিল হেসে ফেলে।

—হয়তো তাই।

মেঘলা বালুর ওপর বসে।

—তুমি বড় হয়ে কী করবে?

—নদী নিয়ে কাজ করব।

—নদী কি তোমার কথা শুনবে?

দলিল উত্তর দেয় না।

রাতে সে থিসিসের খাতা খুলে বসে।

একদিকে সরকারি তথ্য।

অন্যদিকে গ্রামের মানুষের কথা।

কাগজে সে লিখে—

"একটি নদী শুধু পানি নয়। একটি নদী মানে কৃষি, মাছ, সংস্কৃতি, স্মৃতি, মানুষের জীবন। নদী তো কথা কয়। এই আবহমান বাংলার চালিকাশক্তিই তো নদী।"

হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। গত তিনমাস ধরে বিদ্যুতের এই যাওয়া আসা চলছেই। দাদু বললেন কখন কখনও নাকি ১০/১২ ঘন্টা কারেন্ট থাকে আজকাল গ্রামে।

ঘর অন্ধকার হয়ে যায়।

দলিল বাইরে বের হয়।

দূরে নদী দেখা যায় না। শুধু কালো অন্ধকার।

ধলু শেখ উঠানে বসে আছেন।

তিনি বলেন,

—দলিল, তোর ‘বই’ কি নদী ফিরিয়ে আনতে পারবে?

দলিল আকাশের দিকে তাকায়।

অনেক তারা জ্বলছে।

কিন্তু তার কাছে প্রশ্নটার কোনো সহজ উত্তর নেই।

ঠিক তখনই মেঘলা ঘর থেকে বের হয়ে বলে,

—দাদু, নদী যদি সবার হয়, তাহলে তাকে বাঁচানোর দায়িত্ব কার?

ধলু শেখ চুপ করে থাকেন।

দলিলও কিছু বলে না।

দূরে কোথাও অন্ধকারের মধ্যে নদী বয়ে যাচ্ছে।

নাকি শুধু তার স্মৃতিই বয়ে যাচ্ছে—সেটা আর বোঝা যায় না।

লন্ডন, ১০ জুন, ২০২৬