ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৩০ ।। বাজেট শুধু কাগজের হিসাব নয়, এটি মানুষের জীবন–কষ্টের হিসাব
উৎসর্গ
“দেশের মধ্যবিত্ত মানুষদের, যারা নীরবে প্রতিদিনের মূল্যস্ফীতির বোঝা বহন করেন”

দেশের বাজেট নিয়ে কথা উঠলেই আমরা বড় বড় শব্দ শুনি—জিডিপি, প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি। কিন্তু সাধারণ মানুষ এসব শব্দ না বুঝেও প্রতিদিন বাজারে গিয়ে টের পান—জিনিসের দাম বাড়ছে, আয় সেইভাবে বাড়ছে না। বাজেট যদি মানুষের জীবন সহজ না করে, তাহলে সেই বাজেট কাগজে যত সুন্দরই হোক, বাস্তবে তা দুর্বল।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন প্রায় ৫১৭ বিলিয়ন ডলার। লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে এটাকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি বানানো। কিন্তু সমস্যা হলো, গত বছরের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৩.৪৯ শতাংশ, যেখানে এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বছরে গড়ে ৮–৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দরকার। অর্থাৎ গতি এখনো অনেক ধীর।
অন্যদিকে উন্নয়ন হলেও তার সুবিধা সবাই সমানভাবে পাচ্ছে না। গবেষণায় দেখা যায়, দেশের শীর্ষ ১০ শতাংশ পরিবার নিচের ৪০ শতাংশ মানুষের চেয়ে প্রায় ১২ গুণ বেশি আয় করে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কিন্তু তা সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। এই বৈষম্যের মধ্যেই বড় অর্থনীতির স্বপ্ন দাঁড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮.৯ শতাংশ, আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক সময় ১০ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এর মানে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস—খাদ্য—সবচেয়ে দ্রুত দামে বাড়ছে। তুলনায় ভারত প্রায় ৪.১ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম ৩ থেকে ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। তারা কৃষিপণ্যের বাজারে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করেছে, ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমেছে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
বর্তমানে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩.৫ লাখ টাকা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জীবনযাত্রার খরচ দ্রুত বাড়ছে। ঢাকায় একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক খরচ ২০২০ সালে ছিল প্রায় ৪৫ হাজার টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৭০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। অথচ আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি, বরং গড়ে ২৫–৩০ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। ফলে প্রকৃত আয় কমছে এবং ভোক্তা চাহিদাও সংকুচিত হচ্ছে। এই অবস্থায় করমুক্ত আয়সীমা ৫–৬ লাখ টাকা বা তার বেশি হওয়া যৌক্তিক বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
সরকারি বেতন ও পে স্কেল নিয়েও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বেতন ও পেনশন খাতে বড় বরাদ্দ দেওয়া হলেও উৎপাদনশীলতা একই হারে বাড়ছে না। গবেষণায় দেখা গেছে, উৎপাদনশীলতা না বাড়িয়ে বেতন বাড়ালে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। মালয়েশিয়ার উদাহরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তারা বেতন বৃদ্ধি করেছে ধাপে ধাপে এবং প্রতিটি ধাপকে যুক্ত করেছে ডিজিটাল সেবা, ফাইল নিষ্পত্তির সময় কমানো এবং নাগরিক সন্তুষ্টির সঙ্গে। ফলে বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনশীলতাও বেড়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও বড় অদক্ষতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এই খাতে ভর্তুকি ছিল প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ৩.৭ শতাংশ, অথচ ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেও অনেক অর্থ দিতে হচ্ছে। এই কাঠামোগত সমস্যার কারণে ভর্তুকির বড় অংশ কার্যত অপচয় হচ্ছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগও যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ৫.৩ শতাংশ, যা জিডিপির প্রায় ০.৭–০.৮ শতাংশ। অথচ মানুষ নিজের পকেট থেকে প্রায় ৭০ শতাংশ খরচ বহন করে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের একটি শিশু তার সম্ভাব্য উৎপাদনশীলতার মাত্র ৪৮ শতাংশ অর্জন করতে পারে। এর মানে মানবসম্পদ উন্নয়নে বড় ঘাটতি রয়েছে।
কর ব্যবস্থাতেও বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬.৯ শতাংশ, যেখানে ভিয়েতনামে এটি ১৩ শতাংশ এবং ভারতে ১১–১২ শতাংশ। করদাতার সংখ্যা খুবই কম—মাত্র ২.২ শতাংশ মানুষ আয়কর দেন। ফলে রাজস্বের বড় অংশ ভ্যাট ও পরোক্ষ কর থেকে আসে, যা সাধারণ মানুষকেই বেশি চাপ দেয়।
অন্যদিকে অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME), যা মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ শতাংশ তৈরি করে, কিন্তু ব্যাংক ঋণের মাত্র ২০–২৫ শতাংশ পায়। ফলে যেখান থেকে সবচেয়ে বেশি চাকরি তৈরি হয়, সেই খাতই সবচেয়ে কম সহায়তা পায়।
সবশেষে সবচেয়ে বড় চাপ হলো ঋণের সুদ। ২০২৫–২৬ বাজেটে প্রায় ২২ শতাংশ ব্যয় শুধু ঋণের সুদ পরিশোধে যাচ্ছে। এটি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মোট ব্যয়ের চেয়েও বেশি।
সব মিলিয়ে বাজেটের আসল প্রশ্ন একটাই—এটা কি মানুষের জীবন সহজ করছে, নাকি শুধু কাগজে বড় সংখ্যা তৈরি করছে? কারণ শেষ পর্যন্ত বাজেটের সাফল্য মাপা হয় জিডিপি দিয়ে নয়, বরং একজন সাধারণ মানুষ বাজারে গিয়ে কতটা স্বস্তিতে চাল–ডাল কিনতে পারছেন, সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে পারছেন, চিকিৎসা করাতে পারছেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন—তার ওপর।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও গল্পকার
লন্ডন, ১০ জুন ২০২৬