ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১২৯ ।। ঋণ করে খেলে ঘি : জনগণের পেটে সহ্য হবে কি?
উৎসর্গ
“দেশের সাধারণ মানুষদের উদ্দেশে—যাদের কাঁধেই অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ভার”

বাংলাদেশের মানুষ এখন এক অদ্ভুত অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে বাস করছে। একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ, কর্মসংস্থানের সংকট, ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্থর গতি, রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা; অন্যদিকে সরকার নিয়ে আসছে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বাজেট—৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার মহাবাজেট।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাজেট কি দেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নাকি এটি এমন এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা যার ভার শেষ পর্যন্ত জনগণের কাঁধেই এসে পড়বে?
আগামী ১১ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট সরকারের প্রথম বাজেট সংসদে উপস্থাপিত হবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের ভিত্তিতে প্রণীত এই বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও সামনে রাখা হয়েছে।
লক্ষ্যগুলো নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা অনেক সময় রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার চেয়ে কঠিন।
চলতি অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে। গত ১০ মাসেই রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। সরকার ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যয় নির্বাহ করছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে কাঙ্ক্ষিত গতি নেই, বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না, শিল্পখাত নানা চাপে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি বড় আর্থিক জুয়া বলেই মনে হতে পারে।
আরও বড় প্রশ্ন রাজস্ব আয় নিয়ে।
সরকার আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকেই আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই লক্ষ্য কতটা অর্জনযোগ্য?
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খানের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, মানুষের আয় কমেছে, নতুন করদাতা তৈরি হয়নি, অথচ কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ক্রমাগত বাড়ানো হচ্ছে। যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, মূলত তাঁরাই বারবার করের আওতায় আসছেন।
এর অর্থ হলো, সরকার যদি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে চায়, তাহলে করের চাপ বাড়তে পারে। প্রত্যক্ষ কর, পরোক্ষ কর, ভ্যাট কিংবা বিভিন্ন সেবার ফি—যে পথেই হোক, শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের পকেটে। এখানেই সাধারণ মানুষের উদ্বেগের বিষয়।
কারণ বাজেটে আয় বাড়ানোর পরিকল্পনার পাশাপাশি ব্যয়ও বাড়ছে দ্রুতগতিতে। মোট ব্যয়ের বিপরীতে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে আরও ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বাজেটের একটি বড় অংশই দাঁড়িয়ে আছে ঋণের ওপর।
একটি পরিবার যদি আয় থেকে বেশি ব্যয় করে, তাহলে তাকে ধার করতে হয়। রাষ্ট্রও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে পার্থক্য হলো, রাষ্ট্রের ঋণের দায় শেষ পর্যন্ত বহন করে জনগণ। আজ যে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, আগামী দিনের করদাতারা সেই ঋণ ও সুদের বোঝা পরিশোধ করবে।
সেই অর্থে এই বাজেটের প্রকৃত অংশীদার শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মও।
অবশ্য বাজেটে ইতিবাচক কিছু দিক রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। শ্রমবাজার উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নারীর ক্ষমতায়নের জন্যও বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে প্রায় ৫৭ হাজার ৩০২ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে প্রায় ৪৯ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যখন দেশে হামের মতো সংক্রামক রোগে শত শত শিশুর মৃত্যু ঘটছে।
তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—এই ব্যয়ের অর্থ আসবে কোথা থেকে?
সরকার একদিকে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, অন্যদিকে বাজেটের খসড়াতেই বলা হয়েছে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ধাপে ধাপে সমন্বয় করা হবে। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোর চাপও রয়েছে। যদিও আগামী বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তার জন্য ১ লাখ ১৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেই প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা থাকবে।
বাস্তবতা হলো, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং বাজারের প্রতিটি পণ্যের ওপর। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৬.৫ শতাংশ। কিন্তু বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচেও নেমে যেতে পারে। অর্থাৎ সরকারি লক্ষ্য ও বাস্তব অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের মধ্যে যথেষ্ট ব্যবধান রয়েছে।
এই বাজেটের আরেকটি নতুন দিক হলো ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ ধারণা। তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, উদ্ভাবন, সাংস্কৃতিক শিল্প ও স্টার্টআপ খাতকে উৎসাহ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে। তবে এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তব ফল দিতে সময় লাগে; তাৎক্ষণিক রাজস্ব বা অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের হাতিয়ার হিসেবে এগুলো যথেষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি এখন আর কেবল বাজেটের আকার নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো এর বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে।
যদি রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হয়, যদি বিনিয়োগ না বাড়ে, যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হয়, যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে এই বিশাল বাজেটের বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের কাঁধেই এসে পড়বে।
রাষ্ট্রের সাফল্য বাজেটের অঙ্ক দিয়ে নয়, মানুষের জীবনমান দিয়ে বিচার করা হয়। সাধারণ মানুষ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বোঝে না; তারা বোঝে বাজারে চাল, ডাল, তেল, গ্যাস ও ওষুধের দাম। তারা বোঝে চাকরি আছে কি নেই। তারা বোঝে মাস শেষে সংসারের হিসাব মেলে কি মেলে না।
তাই ১১ জুনের বাজেট শুধু অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট নয়; এটি হবে সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন ও সক্ষমতার প্রথম বড় পরীক্ষা।
ঋণ করে ঘি খাওয়া যায়—এ কথা বহু পুরোনো। কিন্তু সেই ঘি যদি হজম না হয়, তাহলে তার মূল্য অনেক বেশি দিতে হয়। আজ দেশের মানুষ তাই জানতে চায়—এই মহাবাজেটের ঘি কি উন্নয়নের শক্তি দেবে, নাকি তার ভারে সাধারণ মানুষের পেটই সবচেয়ে বেশি ব্যথা করবে?
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ৫ জুন ২০২৬