যুক্তরাজ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি ‘বিশ্বে প্রথম’ ভ্যাকসিন উদ্ভাবন

যুক্তরাজ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি ‘বিশ্বে প্রথম’ ভ্যাকসিন উদ্ভাবন

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৫ জুন:

বিজ্ঞানের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় খুলে যেতে পারে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) ব্যবহার করে এমন এক ধরনের ভ্যাকসিন তৈরি করেছেন গবেষকেরা, যা একসঙ্গে বহু ভাইরাস পরিবারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে—এমনকি ভবিষ্যতের মহামারিও প্রতিরোধ করতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে।

গবেষকরা বলছেন, এই প্রথমবারের মতো কোনো ভ্যাকসিনের মূল উপাদান সম্পূর্ণভাবে এআই দিয়ে ডিজাইন করে তা মানুষের শরীরে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।

কী এই নতুন ভ্যাকসিনের ধারণা

সাধারণত ভ্যাকসিন তৈরি করা হয় কোনো নির্দিষ্ট ভাইরাসের একটি নির্দিষ্ট ধরনকে লক্ষ্য করে। কিন্তু ভাইরাসগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রূপ বদলায় বা মিউটেট করে, ফলে পুরোনো ভ্যাকসিন অনেক সময় কার্যকারিতা হারায়।

কেমব্রিজের গবেষক দল এই সীমাবদ্ধতাকে ভাঙতেই নতুন পদ্ধতি নিয়েছে। তারা বিভিন্ন করোনাভাইরাসের জেনেটিক কোড—অর্থাৎ জীবনের ‘নির্দেশনা বই’—সংগ্রহ করে সেগুলো এআই সিস্টেমে বিশ্লেষণ করান। এরপর সেই এআই এমন একটি “সুপার-অ্যান্টিজেন” ডিজাইন করে, যা ভাইরাসের পুরো একটি পরিবারকে চিনে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে।

মানুষের শরীরে প্রথম পরীক্ষা

গবেষকরা জানান, এই প্রযুক্তিতে তৈরি ভ্যাকসিন প্রথমবারের মতো ৩৯ জন মানুষের ওপর পরীক্ষা করা হয়েছে। আরও প্রায় ২০০ জনের ওপর দ্বিতীয় ধাপের ট্রায়াল চলছে, যেখানে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কতটা শক্তিশালী হচ্ছে তা যাচাই করা হবে।

প্রাথমিক ফলাফলে ইমিউন সিস্টেমে প্রভাবকে “মডেস্ট” বা সীমিত বলা হলেও গবেষকেরা এটিকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জোনাথন হিনি বলেন, “আমরা সবসময় ভাইরাসের এক ধাপ পেছনে থাকি। আমরা এখন চেষ্টা করছি সেই ছক ভেঙে ভাইরাসের আগেই পৌঁছে যেতে।”

শুধু করোনা নয়, ফ্লু ও ইবোলার দিকেও নজর

গবেষক দল ইতিমধ্যেই আলাদা প্রকল্পে কাজ করছে এমন ভ্যাকসিন তৈরিতে, যা মৌসুমি ফ্লু বা বার্ড ফ্লু’র মতো রোগের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দিতে পারে। এমনকি ইবোলা ধরনের ভয়াবহ ভাইরাল রোগের বিরুদ্ধেও এআই-নির্ভর টিকা তৈরির চেষ্টা চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি সফল হলে প্রতি বছর নতুন করে ভ্যাকসিন আপডেট করার প্রয়োজন অনেকটাই কমে যেতে পারে।

বিজ্ঞানীদের প্রতিক্রিয়া

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপের পরিচালক প্রফেসর অ্যান্ডি পোলার্ড বলেন, এ ধরনের এআই-নির্ভর পদ্ধতি প্রাণী গবেষণায় ইতিমধ্যেই আশাব্যঞ্জক ফল দেখাচ্ছে এবং মানবদেহে পরীক্ষার ফলই হবে আসল সিদ্ধান্তের মানদণ্ড।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চের বৈজ্ঞানিক পরিচালক প্রফেসর মারিয়ান নাইট এই অগ্রগতিকে “একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

নতুন যুগের ইঙ্গিত

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই যদি সত্যিই ভাইরাসের আচরণ পূর্বাভাস দিতে এবং তার বিরুদ্ধে আগেভাগে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে মহামারির প্রস্তুতির ধারণাই বদলে যাবে।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলছেন—এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণা। মানুষের ওপর বড় পরিসরে সফলতা প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত একে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না।

তবুও একথা স্পষ্ট—ভাইরাসের সঙ্গে মানুষের লড়াইয়ে এবার হয়তো প্রথমবারের মতো “আগে থেকেই প্রস্তুত” থাকার এক নতুন যুগের দরজা খুলছে।