মানব সভ্যতায় নবরূপে চাঁদ আর পৃথিবী!
।। গোলাম কবির ।।
আর্টেমিস-২ থেকে অরিয়ন মডিউলে চড়ে একমাত্র নারী ক্রিষ্টিনা কচ (কক) সহ নাসার যে ৪ জন নভোচারি বৈজ্ঞানিক পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরবর্তী পার্শ্বে অবলোকন এবং পর্যবেক্ষণে গিয়েছেন তারা আর একদিন পর ভালোয় ভালোয় ফিরে আসুন পৃথিবীতে, এই কামনায় কাটছে।
চাঁদের যে অংশ অর্থাৎ আমরা চাঁদের যে পৃষ্ঠ দেখি, সাধারণ সূর্যের আলোতে তার উলটো দিকের অর্ধাংশ ভ্রমণ করার পরিকল্পনা নিয়েই গেছেন উক্ত চারজন দু:সাহসী নভোচারী।

পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা সম্ভাব্য নিন্মতম ব্যবধানে থেকে পর্যবেক্ষণ শেষে ফিরে আসছেন আটলান্টিক সাগর জলে।
নিয়ম অনুযায়ী সেখান থেকে তাদের হাসপাতালে নেয়া হবে।
নাসার সর্বশেষ মিশনের এই অংশের হবে সমাপ্তি। অত:পর নভোচারি ৪ জনের এবং নাসার বিভিন্ন স্যাটেলাইট স্টেশন থেকে তোলা অসংখ্য ছবি, ভিডিও ইত্যাদির উপর চালানো হবে প্রচুর গবেষণা।

এইযে পৃথিবী, সূর্য, নক্ষত্র, চাঁদ, গ্রহাদি, গ্রহকনা, উড়ন্ত চলন্ত ঘূর্ণয়মাণ আরো বহুকিছু রয়েছে "আমাদের মহাশুন্যে" তার সবটাই আমাদের গ্যালাক্সি (মিল্কিওয়ে ছায়াপথ)।
আমাদের নিকটবর্তী পড়শি গ্যালাক্সি হচ্ছে এন্ড্রোমিডা। পার্শ্ববর্তী, দূরবর্তী মহাশুন্যে রয়েছে এমনি আরো অগণিত গ্যালাক্সি!
সুতরাং মহাশূন্যের ব্যাপকতা কেবল অসীমই নয়, অকল্পনীয়! আর সেই মহাশুন্যে কতো যে মহাবিশ্ব আছে তাও অকল্পনীয়!
এই সকল তথ্যের মধ্যে কেবল আমাদের বিশ্বের প্রাণী, উদ্ভিত, সূর্যালোক, জল, মানবজাতি, পাহাড় পর্বত, বায়ু, খনিজ পদার্থ, সাগরসম্পদ ইত্যাদি সম্পর্কেই আমরা কমবেশি অবহিত, অন্য কোনো বিশ্বের সম্পর্কে নই! অন্য আরো অনেক বিশ্বের (গ্রহের) সন্ধান পেয়েছে মানুষ, কিন্তু অনাবিষ্কৃত সে'সব এখনো।

বিজ্ঞানিরা মহাবিশ্বের বাকি অনেক কিছু সম্পর্কেই অবহিত। কিন্তু ধর্মীয় ভাবাবেগে অধিকাংশ মানুষই বিজ্ঞান-ভাবনার চাইতে ধর্মীয় ঈশ্বর-ভাবনাকে গুরুত্ব দেয় অধিক। ফলে বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানার্জন নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ নেই মোটেই! অথচ বিজ্ঞানের বাস্তবতাই হলো বাস্তব বিশ্বের প্রকৃত রূপ!
মানুষ মনের আবেগে ধর্মকে চর্চা করতে গিয়ে বিশ্ববাস্তবতাকে অবহেলা করে স্বাভাবিকভাবেই! অথচ বিজ্ঞান-ধারায় আবিষ্কৃত মানবসভ্যতার সকল কিছুই মানুষ ব্যবহার করছে সারা বিশ্বজুড়েই!
বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে দেখা যায় অসংখ্য মানুষ একাডেমিক শিক্ষা নিয়েও ধর্মান্ধতায় ভুগছেন নেক্কারজনক ভাবে! বিশেষ করে ফেইসবুকের কথোপকথনে ধরা পড়ে অসংখ্য হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান মানুষদের ধর্মান্ধতাজনিত দু:খজনক অজ্ঞানতা, আহম্মকী, হাস্যকর মন্তব্য, ক্রোধ, জিঘাংসা, জঙ্গিবাদীতা, মুর্খতা!
ফলত: দুনিয়ার মানুষ ধর্মকেই অধিক গুরুত্ব দেয়, বিজ্ঞানকে নয়! এটাই মানব সভ্যতার সকল ট্র্যাজেডির মূল ট্র্যাজেডি!
ধর্ম মানুষের স্বাভাবিক মানসিকতাকে অস্বাভাবিক করে তোলে, অপ্রকৃতিস্থ করে তোলে, অসুস্থ করে তোলে! আর ধর্মের এই ব্যাধিটার শুরু হয় ঈশ্বর-চিন্তাসূত্র থেকে আগত ঈশ্বর-ভীতি সংক্রান্ত "বিশ্বাস" থেকে!
তার খুবই প্রকৃষ্ট উদাহরণ: পৃথিবী গোল, সূর্যের চারদিকে ঘূর্নয়মান, চাঁদ পৃথিবীর একটি উপগ্রহ। অথচ প্রাচীনকাল থেকে প্রায় সকল ধর্মই গ্রহ, নক্ষত্র, পৃথিবী, চাঁদ, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি সবকিছুকেই দেবতার আসনে বসিয়ে পূজা অর্চনার বিষয় বানিয়ে রেখেছে! দীর্ঘকাল খৃষ্ট পুরোহিতরা বিশ্ব সত্য সম্পর্কে সমাজের জ্ঞানি মানুষদের স্বাধীন মতপ্রকাশে বাধা দিয়েই শুধু আসছিলোনা, কাউকে কাউকে নির্মম মৃত্যুদন্ডও দিয়েছিলো চার্চভিত্তিক পুরোহিত সমাজ!
পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে- এই সত্য তথ্যটি এখনো ইসলাম, খৃস্ট, সনাতন ধর্মের অনেকেই মানতে চায়না!
মহাজাগতিক ক্রিয়াকলাপকে ধর্মীয় পুরোহিতরা ঈশ্বরের কর্মকান্ড হিসেবে বিশ্বাসপূর্বক উপাসনা করেন এবং সেইমত মানুষকে পরিচালিত করে চলেছেন!
উনসত্তর সালে যখন নাসার পক্ষ থেকে এপেলো ১১ তে ৩ জন নভোচারি চাঁদের পৃষ্ঠে গেলেন এবং ২ জন মাটিতে নেমে হাঁটলেন একজন মডিউল নভোযানে অপেক্ষা করেছিলেন সেই ঘটনাকে মৌলবাদি ধর্মীয় গোষ্ঠী মিথ্যা বলেছিলেন এমন কি পরবর্তীতে তারা বানোয়াট ভিডিও দিয়ে প্রচারও করেছিলেন যে নীল আর্মস্ট্রং, বাজ আল্ড্রিন, মাইকেল কলিন্স নাকি আমেরিকারই কোনো মরুভূমিতে ঐ চন্দ্রাবতরণের ভিডিও সুট করেছিলেন!
এরপরেও নাসার এপোলো ১২, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭ তে করেও আরো ১০ জন নভোচারী চাঁদে পা রেখেছিলেন। তবে ১৯৭২ এর পর আর কেউ চাঁদে পা রাখেননি।
এবার নাসার এই আর্মেটিস-২ মিশনে পর্যবেক্ষণে গিয়ে নভোচারিরা চন্দ্রের অন্য পার্শ্বে নিকটতম কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করেছেন, যা মানব সভ্যতার মহাশুন্যাভিযানে এই প্রথম। কিন্তু চাঁদে তারা নামেননি। সাথে সাথে চাঁদ থেকে তারা সূর্যোদয়ের মতো দেখেছেন পৃথিবীর উদয়! নতুন রূপে দেখেছেন নীল পৃথিবী! পৃথিবীকে তারা দেখেছেন চাঁদের মতো এক ফালি! যেমন আমরা পৃথিবী থেকে একফালি চাঁদ দেখে পরদিন ঈদ উৎসব করি!
কেউ কেউ লিখেছেন যে, যদি চাঁদে মানুষ থাকতো তবে তাদের সেদিন ঈদ হতো!
এবারই প্রথম নভোচারীরা দেখতে পেলেন চন্দ্রপৃষ্ঠে বিশাল বিস্তৃত গর্ত যার দৈর্ঘ আনুমানিক ৬০০ মাইল!
আমাদের পৃথিবী, চাঁদ এবং সূর্য নিয়ে আমরা এই যে গবেষণা, আলোচনা, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ, প্রদক্ষিণ ইত্যাদি করছি তা হলো আংশিক মহাবিশ্ব। এমনকি আমাদের পুরা গ্যালাক্সি নিয়েও যদি আমরা তা করি তবুও তাই। গোটা মহাবিশ্বকে নিয়ে গবেষণা করার মতো সামর্থ এখনো আসেনি মানুষের। তাহলে কি ওসব ঈশ্বরের কাজ বলে ছুঁড়ে ফেলে দেবে মানুষ! সময় এসেছে ভেবে দেখার!
গোলাম কবির : নাট্য ব্যক্তিত্ব ও কমিউনিটি একটিভিস্ট
লন্ডন,২৫ এপ্রিল ২০২৬