ভাঙনের শব্দ শুনি সংস্কৃতির অঙ্গনেও
ভয়েস অব পিপল, বিনোদন ডেস্ক, ২৫ এপ্রিল:
রাজনীতির বিভাজন আর দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি এখন স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনেও। নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, মতাদর্শগত বিরোধ এবং ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব মিলিয়ে একের পর এক সাংস্কৃতিক সংগঠন আজ ভাঙনের মুখে। নতুন সংগঠন গড়ে ওঠার পাশাপাশি পুরোনো সংগঠনগুলোও দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পড়ছে। ফলে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐক্যের চিত্র ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছে।

সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনদের মতে, এই ভাঙন শুধু সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বরং এটি সমাজে একটি নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে ঐক্যের প্রয়োজনীয় সময়ে এই বিভক্তি সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে দুর্বল করছে।
সবচেয়ে আলোচিত বিভক্তির মধ্যে রয়েছে দেশের অন্যতম প্রাচীন সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। নেতৃত্ব ও মতাদর্শগত বিরোধকে কেন্দ্র করে সংগঠনটি সম্প্রতি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একপক্ষের নেতৃত্বে আছেন জামশেদ আনোয়ার তপন এবং অপরপক্ষের নেতৃত্বে অমিত রঞ্জন দে।
দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলছে। একপক্ষ অন্যপক্ষকে জামায়াতপন্থী হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে, আবার পাল্টা অভিযোগে বলা হচ্ছে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠতার কথা। এই ট্যাগিংয়ের রাজনীতি শুধু মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং একাধিক ক্ষেত্রে তা হাতাহাতি ও উত্তেজনার পর্যায়েও পৌঁছেছে। এতে তৃণমূল কর্মী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকেই বিব্রত।

সংস্কৃতি অঙ্গনের একাংশ মনে করছে, রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব সংকটই এই বিভাজনের মূল কারণ। কেউ কেউ আবার দাবি করছেন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির একজন প্রবীণ নেতার ভূমিকাও এই বিভক্তিতে প্রভাব ফেলেছে বলে আলোচনা রয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী সংগঠনগুলোর ইতিহাসও এখন ভাঙনের ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। ষাটের দশকে সত্যেন সেন প্রতিষ্ঠিত উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী একসময় ছিল দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শক্তি। কিন্তু গত বছরই নেতৃত্বের প্রশ্নে সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়। এর প্রভাব এখনো কাটেনি।
আরও পুরোনো একটি উদাহরণ হলো খেলাঘর। ১৯৫০-এর দশকে শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই সংগঠনটি নব্বইয়ের দশকে নেতৃত্বগত দ্বন্দ্বে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে দুই শাখার নেতৃত্ব দিয়েছেন অধ্যাপক পান্না কায়সার ও অধ্যাপক মাহফুজা খানম। বর্তমানে দুই নেতাই প্রয়াত হলেও সংগঠনটি আর একীভূত হয়নি।
আবৃত্তি সংগঠন কণ্ঠশীলন-ও নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে বিভক্ত হয় এক দশক আগে। এরপর একাধিক গ্রুপে বিভাজন তৈরি হয়, যার প্রভাব আজও বিদ্যমান।
নাট্যাঙ্গনে বিভাজন যেন এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতা। লোকনাট্যদল একসময় তিনটি আলাদা শাখায় বিভক্ত হয়—টিএসসি, বনানী এবং সিদ্ধেশ্বরী। যদিও দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে, তবুও অভ্যন্তরীণ দূরত্ব এখনো রয়ে গেছে।
একইভাবে থিয়েটার থেকেও একাধিক শাখা তৈরি হয়েছে—বেইলি রোড, তোপখানা ও নাট্যকেন্দ্র নামে আলাদা আলাদা দল গড়ে ওঠে। এরপর পদাতিক নাট্য সংসদ থেকেও একাধিক বিভাজন ঘটে, যার ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় ঢাকা পদাতিক, থিয়েটার আর্ট ইউনিট এবং পরবর্তীতে অনুস্বর।
এই দলগুলোর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও অনেক জায়গায় এখনো রয়েছে দূরত্ব ও অঘোষিত বিচ্ছিন্নতা।
নাগরিক নাট্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়-ও একাধিকবার বিভক্ত হয়েছে। এর থেকে জন্ম নেয় নাগরিক নাট্যাঙ্গন, নাগরিক নাট্যাঙ্গন অনসাম্বল, নাট্যতীর্থ, এথিক নাট্যদল এবং পরবর্তীতে প্রাঙ্গণেমোর ও থিয়েটারিয়ান। এই দীর্ঘ বিভাজন ইতিহাস এখনো সাংস্কৃতিক অঙ্গনের আলোচনায় থাকে।
একইভাবে ঢাকা থিয়েটার এবং আরণ্যক নাট্যদল থেকেও একাধিক শিল্পী বের হয়ে গিয়ে নতুন ধারা তৈরি করেছেন, যদিও সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি।
এদিকে প্রাচ্যনাট গঠিত হয়েছে আরণ্যক থেকে বেরিয়ে আসা কিছু শিল্পীর মাধ্যমে। শুরুতে সম্পর্ক থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের অন্যতম সংগঠন গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন-এও এখন বিভক্তি ও নেতৃত্ব সংকট স্পষ্ট। সাংগঠনিক নীতি, নেতৃত্ব নির্বাচন এবং মতাদর্শ নিয়ে সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ বাড়ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই বিভাজন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এটি আরও বড় সংকটে পরিণত হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেন, সংস্কৃতির অঙ্গনে যখন ঐক্য প্রয়োজন, তখন বিভাজন ও বিরোধ অশুভ বার্তা দেয়। তার মতে, ভিন্ন মত থাকা স্বাভাবিক হলেও প্রগতিশীল চিন্তার জায়গা থেকে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি।
সংস্কৃতি অঙ্গনের এই ভাঙন তাই শুধু সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। যেখানে মতভেদ, নেতৃত্বের লড়াই এবং আস্থার সংকট মিলিয়ে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে ঐক্যের ভিত্তি।