কলিকালের কলধ্বনি ।। ১০১ ।।   অবিশ্বাসের রাজনীতি আর রাজনীতিতে অবিশ্বাস: বিশ্ববাসীর উঠছে নাভিশ্বাস

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১০১ ।।    অবিশ্বাসের রাজনীতি আর রাজনীতিতে অবিশ্বাস:  বিশ্ববাসীর উঠছে নাভিশ্বাস

“উৎসর্গ:

সেই সব সাধারণ মানুষকে—যারা যুদ্ধ চায় না, তবু যুদ্ধের মূল্য দেয়; যারা সিদ্ধান্ত নেয় না, তবু সিদ্ধান্তের ভার বহন করে।”

 

ইসলামাবাদের একুশ ঘণ্টার বৈঠক শেষ হয়েছে। টেবিলে ছিল কাগজ, কলম, কূটনৈতিক ভাষা—কিন্তু অনুপস্থিত ছিল সবচেয়ে জরুরি উপাদানটি: বিশ্বাস। ফলাফল তাই অনুমেয়—চুক্তি হয়নি, বিবৃতি হয়েছে; সমাধান আসেনি, দায় চাপানোর প্রতিযোগিতা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটিই এখন “ম্যানেজড ক্রাইসিস”—সংকটকে নিয়ন্ত্রণে রেখে দীর্ঘায়িত করার এক নতুন কৌশল।

আজকের বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট এখানেই। একদিকে অবিশ্বাসকে পুঁজি করে রাজনীতি করা হচ্ছে, অন্যদিকে রাজনীতিকদের ওপর মানুষের বিশ্বাস ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। সাম্প্রতিক জরিপগুলো (যেমন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক থিংক ট্যাঙ্কের রিপোর্ট) দেখাচ্ছে, বিশ্বের বহু দেশে জনগণের বড় একটি অংশ মনে করে তাদের সরকার সত্য গোপন করে বা আংশিক সত্য বলে। এই দ্বৈত সংকটের মাঝখানে পড়ে সাধারণ মানুষ—যাদের জন্য নীতি, কূটনীতি, যুদ্ধবিরতি—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত কেবল খবরের কাগজের শিরোনাম।

যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা “রেড লাইন” পরিষ্কার করেছে। ইরান বলছে, তারা “অধিকার” থেকে একচুলও সরে আসবে না। এই দুই বাক্যের মাঝখানে লুকিয়ে আছে পুরো কাহিনি। এক পক্ষের নিরাপত্তা আরেক পক্ষের সার্বভৌমত্বে আঘাত করে; এক পক্ষের দাবি আরেক পক্ষের কাছে অপমান। ফলে আলোচনার টেবিলে বসেও তারা যেন ভিন্ন দুই ভাষায় কথা বলে। ইতিহাস বলছে, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) যখন হয়েছিল, তখনও এই আস্থার সংকট পুরোপুরি কাটেনি; বরং সাময়িকভাবে স্থগিত হয়েছিল। পরে সেই চুক্তি ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়েছে—বিশ্বাস ছাড়া কোনো চুক্তিই টেকসই নয়।

এখানে প্রশ্ন ওঠে—এই আলোচনাগুলো আসলে কার জন্য? রাষ্ট্রনেতাদের জন্য, নাকি মানুষের জন্য? যদি মানুষের জন্য হতো, তাহলে কি এত সহজে ভেঙে যেত? একুশ ঘণ্টা সময় কি এতটাই কম ছিল যে একটি বিশ্বাসের সেতু গড়ে তোলা গেল না? নাকি সেতু গড়ার ইচ্ছাটাই অনুপস্থিত ছিল? বাস্তবতা হলো, অনেক সময় আলোচনার লক্ষ্য সমাধান নয়, বরং অবস্থানকে বৈধতা দেওয়া—নিজ নিজ জনগণের কাছে শক্ত অবস্থান প্রদর্শন করা।

বিশ্বনেতাদের ভাষা এখন খুব চেনা। তারা বলেন “শান্তি”, কিন্তু প্রস্তুতি নেন যুদ্ধের; বলেন “স্থিতিশীলতা”, কিন্তু চালান শক্তির খেলা; বলেন “মানবাধিকার”, কিন্তু দেখেন নিজেদের স্বার্থ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে—যা প্রমাণ করে কথার চেয়ে প্রস্তুতি অনেক বেশি আগ্রাসী। এই দ্বিচারিতা এতটাই প্রকাশ্য হয়ে গেছে যে, এখন আর সেটিকে কূটনীতি বলা যায় না—এটি একধরনের রাজনৈতিক অভিনয়।

হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা, লেবাননে সংঘর্ষ, ইরানে তথ্য নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু মিলিয়ে যে চিত্রটি তৈরি হচ্ছে, তা কেবল একটি অঞ্চলের সংকট নয়; এটি বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ এই হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে লন্ডন থেকে ঢাকা—সবখানেই। অর্থাৎ, একটি আঞ্চলিক সংঘাত এখন আর আঞ্চলিক থাকে না; তা হয়ে ওঠে বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি।

বিশ্বনেতারা প্রায়ই বলেন, “সমস্যা জটিল।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, সমস্যাকে জটিল করে তোলার পেছনেও তো তাদেরই ভূমিকা রয়েছে। যখন প্রতিটি সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব থাকে, তখন শান্তি কখনোই সরল পথে আসে না। বরং সেটি হয়ে ওঠে আলোচনার একটি অজুহাত—যেখানে সময় কাটে, কিন্তু সমাধান আসে না। কূটনীতির এই দীর্ঘসূত্রিতা অনেক সময় ইচ্ছাকৃত—কারণ অনিশ্চয়তা ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করে।

এই অবস্থায় সাধারণ মানুষের অনুভূতি কী? তারা যুদ্ধ চায় না, নিষেধাজ্ঞা চায় না, জ্বালানি সংকট চায় না। তারা চায় স্বাভাবিক জীবন—নিরাপদ কাজ, স্থিতিশীল বাজার, নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ। কিন্তু তাদের সেই চাওয়াটা বিশ্ব রাজনীতির বড় টেবিলে খুব ছোট হয়ে যায়। ফলে তাদের নাভিশ্বাস বাড়ে—অর্থনীতিতে, নিরাপত্তায়, মানসিকতায়। মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা কমে, দরিদ্রের বেঁচে থাকা কঠিন হয়, আর অনিশ্চয়তার ভারে সমাজে বাড়ে হতাশা।

বিশ্বনেতারা যেন আজকাল সমস্যার সমাধান করতে অক্ষম, বরং সমস্যাকে ধরে রাখতে বেশি দক্ষ। কারণ সমাধান হয়ে গেলে আলোচনার প্রয়োজন থাকে না, প্রভাব কমে যায়, নিয়ন্ত্রণের সুযোগও সীমিত হয়। তাই হয়তো আলোচনার দরজা খোলা থাকে, কিন্তু বের হওয়ার পথটি অদৃশ্য থাকে—একটি “চলমান সংকট”-এর মধ্যে সবাইকে আটকে রাখা হয়।

তাহলে উপায় কী?

উপায় খুব জটিল নয়, কিন্তু কঠিন। প্রথমত, আস্থার রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে হবে—যেখানে চুক্তি কেবল কাগজে নয়, মনেও প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয়ত, স্বার্থের বাইরে গিয়ে বাস্তব মানবিক পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিতে হবে—যেখানে একজন সাধারণ মানুষের জীবনকে পরিসংখ্যান নয়, বাস্তবতা হিসেবে দেখা হবে। তৃতীয়ত, শক্তির প্রদর্শনের বদলে দায়িত্বশীলতার চর্চা করতে হবে—যেখানে নেতৃত্ব মানে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সমাধান।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ইচ্ছা কি আছে?

ইসলামাবাদের ব্যর্থ বৈঠক সেই প্রশ্নটিকেই আবার সামনে এনে দিয়েছে। একুশ ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়নি; বরং উন্মোচিত হয়েছে এক নির্মম সত্য—বিশ্ব রাজনীতি এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে কথার চেয়ে সন্দেহ বেশি শক্তিশালী।

আর সেই সন্দেহের বোঝা বইছে গোটা পৃথিবীর সাধারণ মানুষ—নিঃশব্দে, প্রতিদিন, একটু একটু করে। কতদিন এ অবস্থা চলবে কেউ জানে না!

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ১২ এপ্রিল