ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১২ এপ্রিল:
ইসলামাবাদে একুশ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি। বহু প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হওয়া এই বৈঠক শেষ পর্যন্ত বিশ্ববাসীর মনে নতুন করে হতাশার জন্ম দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমার বদলে বরং আরও অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে গেছে পরিস্থিতি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনার পর স্পষ্টভাবে জানান, তারা নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছিল, কিন্তু ইরান সেই শর্ত মেনে নেয়নি। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল ইরান স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিক যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। কিন্তু ইরান এ ধরনের শর্তকে একতরফা ও অযৌক্তিক বলে আখ্যা দেয়।
এই বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর দুই দেশ মুখোমুখি বসেছে—এটিই ছিল বড় আশার জায়গা। কিন্তু আলোচনার টেবিলেই স্পষ্ট হয়ে যায়, শুধু মুখোমুখি হওয়া যথেষ্ট নয়; বিশ্বাসের সংকট এখনো এতটাই গভীর যে, সমঝোতার পথে এগোনো কঠিন।

আলোচনার ব্যর্থতার পরপরই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে হরমুজ প্রণালী এলাকায়। পেন্টাগনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের দুটি যুদ্ধজাহাজ সেখানে ইরানের পেতে রাখা মাইন অপসারণের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু ইরানি বাহিনী তাদের সতর্ক করে এবং পরে মার্কিন জাহাজ সরে যায়। যদিও ইরান এই ঘটনার পুরোপুরি অস্বীকার করেছে।
তবে একই সময়ে তিনটি সুপারট্যাংকার নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে, যা ইঙ্গিত দেয়—ইরান হয়তো বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কিছুটা নমনীয়তা দেখাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি কৌশলগত পদক্ষেপ—একদিকে চাপ বজায় রাখা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রাখা।
এই আলোচনায় উঠে এসেছে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও চলমান সংঘাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের অবস্থান এতটাই ভিন্ন যে, এক বৈঠকে তার সমাধান পাওয়া সম্ভব হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল বৈঠক শেষে দ্রুত দেশে ফিরে গেছে, যা কূটনৈতিক ভাষায় অচলাবস্থার ইঙ্গিত বহন করে। তবে আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ভবিষ্যতে আবারও সংলাপ হতে পারে, কিন্তু তার সময় ও ফলাফল এখনো অনিশ্চিত।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ একটি বাস্তবতাই সামনে নিয়ে এসেছে—শুধু আলোচনা নয়, সমঝোতার জন্য প্রয়োজন আস্থা ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা। সেই জায়গাতেই এখনো বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
একুশ ঘণ্টার আলোচনায় কাগজে কোনো চুক্তি হয়নি, কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয় হলো—বিশ্ববাসীর মনে যে শান্তির আশা তৈরি হয়েছিল, সেটিই ভেঙে গেছে। সংঘাতের ছায়া এখনো কাটেনি; বরং নতুন করে আরও গভীর হয়েছে।
বৈঠক শেষে, কি হতে পারে পরিশেষে?
ইসলামাবাদে ভেঙে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শান্তি আলোচনার পর নতুন করে অনিশ্চয়তায় ডুবে গেছে মধ্যপ্রাচ্য। একুশ ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর কোনো শান্তি আলোচনার পরিকল্পনা নেই। ফলে কূটনৈতিক সম্ভাবনার দরজা আংশিক খোলা থাকলেও বাস্তবতা বলছে, দূরত্ব কমেনি—বরং বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট JD Vance ইসলামাবাদ ত্যাগ করেন রোববার সকালে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র তাদের “চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব” উপস্থাপন করেছিল, কিন্তু ইরান তা গ্রহণ করেনি। তার ভাষায়, আলোচনার পর দুই পক্ষের মধ্যে মূল ইস্যুগুলোতে ব্যবধান থেকেই গেছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো নিশ্চয়তা দিতে না পারাই অচলাবস্থার বড় কারণ।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র Esmail Baghaei বলেন, আলোচনার পুরো পরিবেশ ছিল অবিশ্বাসে ভরা। তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেন—কিছু বিষয়ে সীমিত অগ্রগতি হয়েছে এবং কূটনীতি কখনো পুরোপুরি শেষ হয় না। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পরবর্তী বৈঠকের সময়, স্থান বা কাঠামো এখনো নির্ধারিত হয়নি।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার Mohammad Baqer Ghalibaf সরাসরি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট—সমস্যা কেবল নীতিগত নয়, বরং গভীর আস্থাহীনতার সংকট।
ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট Reza Aref বলেন, ইসলামাবাদের আলোচনায় তাদের প্রধান দাবি ছিল—হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলায় হওয়া ক্ষতির ক্ষতিপূরণ। তার মতে, এগুলো “ইরানি জনগণের ন্যায্য অধিকার” এবং এ বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার Haji Babaei দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এটি কোনোভাবেই আলোচনার বিষয় নয়। তিনি আরও জানান, সংসদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য এই অবস্থান সমর্থন করেছেন এবং দেশ তাদের দাবিতে একচুলও ছাড় দেবে না।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা শুধু কূটনীতির টেবিলেই সীমাবদ্ধ নেই। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে Benjamin Netanyahu-এর নেতৃত্বাধীন ইসরায়েল। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে মানবিক উদ্বেগও বাড়ছে।
ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু Pope Leo XIV লেবাননের মানুষের প্রতি সংহতি জানিয়ে বলেছেন, যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বেসামরিক জনগণকে রক্ষা করা আন্তর্জাতিক ও নৈতিক দায়িত্ব। তিনি চলমান সংঘাতের অবসানে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী Keir Starmerও সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের উচিত আর কোনো উত্তেজনা না বাড়ানো। ওমানের সুলতানের সঙ্গে আলোচনায় তিনি যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বক্তব্য ঘিরে তুরস্কের সঙ্গে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তুর্কি কর্মকর্তারা তার মন্তব্যকে উসকানিমূলক ও শান্তি প্রচেষ্টার জন্য ক্ষতিকর বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এরই মধ্যে ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ থাকার ঘটনা ৪৪ দিনে গড়িয়েছে, যা দেশটির ভেতরে তথ্যপ্রবাহ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এটি আধুনিক বিশ্বের দীর্ঘতম ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটগুলোর একটি।
সব মিলিয়ে ইসলামাবাদের ব্যর্থ আলোচনার পর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—সংঘাত কেবল সামরিক নয়, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও জটিল আকার ধারণ করছে। আলোচনার টেবিলে কিছু অগ্রগতি হলেও মূল সমস্যাগুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
একুশ ঘণ্টার বৈঠক শেষ হয়েছে, প্রতিনিধিরা ফিরে গেছেন, বিবৃতি দেওয়া হয়েছে—কিন্তু বিশ্ববাসীর মনে যে শান্তির ক্ষীণ আলো জ্বলছিল, সেটি আবারও ম্লান হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন একটাই—পরবর্তী আলোচনার আগেই কি বাস্তবতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে?