বাংলাদেশে প্রাইভেট হাসপাতাল চালাতে হলেও দিতে হয় চাঁদা!
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৯ এপ্রিল:
রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকায় সরকারি হাসপাতালকে ঘিরে গড়ে ওঠা বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত এখন চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের এক অন্ধকার বলয়ে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক ও পুনর্বাসন ইনস্টিটিউট, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, জাতীয় কিডনি ও ইউরোলজি হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি হাসপাতালকে ঘিরে অন্তত ৬০টির বেশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক গড়ে উঠেছে শেরেবাংলা নগর, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায়।

সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরেই এসব বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে ওষুধ, খাবার, আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে একটি প্রভাবশালী চক্র, যারা মাসিক চাঁদার বিনিময়ে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে মাসে গড়ে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ কাঠামো বদলে যায়। আগে মোহাম্মদপুর ও শেরেবাংলা নগর থানা এলাকার যুবলীগ-সমর্থিত একটি সিন্ডিকেট এসব নিয়ন্ত্রণ করলেও বর্তমানে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নতুন একটি গ্রুপ নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই গ্রুপ রাজনৈতিক পরিচয়ের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
এরই মধ্যে শ্যামলীর ৩ নম্বর রোডে অবস্থিত সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. কামরুল ইসলামের কাছে মাসিক ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন যুবদলের নামধারী মঈন উদ্দিন। তবে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিষয়টি প্রকাশ্যে সংঘাতে রূপ নেয়।
স্থানীয় সূত্র আরও জানায়, এই চক্রের নেতৃত্বে থাকা মঈন উদ্দিনের বিরুদ্ধে শুধু হাসপাতাল নয়, বিভিন্ন খাতেও চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। আগারগাঁও এলাকায় স্ট্রিট ফুডের প্রায় ৩০০ দোকান থেকে দৈনিক ভিত্তিতে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে, যা বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে থাকে।
একটি বেসরকারি হাসপাতালের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নির্বাচনের আগে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা দিতে হতো। এখন তা এক লাফে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে। চাঁদা না দিলে হুমকি আসে, কখনও প্রতিষ্ঠান দখলের ভয় দেখানো হয়।”
পুলিশ সূত্র জানায়, এসব অভিযোগের বিষয়ে লিখিতভাবে সব প্রতিষ্ঠান এখনো থানায় জানায়নি। তবে সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালের মামলার পর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও মুখ খুলতে শুরু করেছে। শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলায় মঈন উদ্দিনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।
এদিকে তদন্তে উঠে এসেছে আরও বিস্তৃত একটি অপরাধচক্রের চিত্র। অভিযোগ অনুযায়ী, এই গ্রুপ শুধু চাঁদাবাজিই নয়, জমি দখল, আবাসিক এলাকা নিয়ন্ত্রণ, মাদক ব্যবসা এবং কিশোর গ্যাং পরিচালনার সঙ্গেও জড়িত। শেরেবাংলা নগর এলাকার বিভিন্ন মোড়ে মাদক বেচাকেনা ও আসর বসানোর অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই চক্রের পৃষ্ঠপোষকতায় একাধিক কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে, যারা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছে এবং প্রতিবাদকারীদের হুমকি দিচ্ছে।
শ্যামলী এলাকায় কিছু আবাসিক হোটেলেও মাদক সরবরাহ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যার নিয়ন্ত্রণও একই চক্রের হাতে বলে দাবি স্থানীয়দের।
সরকারি হাসপাতালগুলোর সামনে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস থেকেও নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের সামনে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ড কার্যত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে একটি প্রভাবশালী গ্রুপের।
সম্প্রতি একটি জমি সংক্রান্ত বিরোধে জান্নাতুল ফেরদৌস মসজিদের পাশের একটি নির্মাণ কাজও বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মঈন উদ্দিনের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। জমির মালিকপক্ষ দাবি করেছে, দীর্ঘদিন ধরেই ওই জায়গার ওপর নজর ছিল এই চক্রের।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত মঈন উদ্দিন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আদালত ইতোমধ্যে তার চার সহযোগীকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এই চক্রের পুরো নেটওয়ার্ক খুঁজে বের করতে তদন্ত আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় শেরেবাংলা নগর ও আশপাশের এলাকায় বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, শুধু একজন বা একটি গ্রুপ নয়, পুরো একটি কাঠামোগত চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক এখানে সক্রিয়, যা ভেঙে না ফেললে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।