কয়েকটি জেলায় ছাত্রলীগের মিছিল ও গ্রেফতার, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

কয়েকটি জেলায় ছাত্রলীগের মিছিল ও গ্রেফতার, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১০ জুন:

নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিল, বিক্ষোভ কর্মসূচি ও পরবর্তী পুলিশি অভিযানের ঘটনা সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলায় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লালমনিরহাট, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ ও পটুয়াখালীসহ একাধিক এলাকায় আকস্মিক মিছিলের খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার পর কোথাও গ্রেফতার, কোথাও মামলা এবং কোথাও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সবচেয়ে বড় পুলিশি অভিযানটি ঘটে কুমিল্লায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পোদুয়ার বাজার ও সুয়াগাজী এলাকায় ছাত্রলীগের ব্যানারে ঝটিকা মিছিলের অভিযোগে অভিযান চালিয়ে ৪৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় ২০৮ জনকে আসামি করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। গ্রেফতারদের আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পুলিশ জানিয়েছে, মিছিলটি স্বল্প সময়ের জন্য হলেও ভিডিও ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত করা হয়েছে।

চট্টগ্রামেও একই ধরনের একাধিক ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। নগরীর জিইসি মোড়, আগ্রাবাদ, ষোলশহর, মুরাদপুর, আউটার রিং রোড, বারিক বিল্ডিং এলাকা এবং আনোয়ারা ও ফটিকছড়ির কয়েকটি স্থানে ব্যানার ও মশাল নিয়ে ঝটিকা মিছিল বের করা হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। জিইসি মোড় এলাকায় শতাধিক কর্মীর অংশগ্রহণে একটি মিছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে পুলিশের অভিযানে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত যানবাহনও জব্দ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

নোয়াখালীতে ঘটে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। সদর উপজেলার নোয়ান্নই ইউনিয়নের বাঁধের হাট বাজারে জুমার নামাজের পর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, শুরুতে পুলিশ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও মিছিলকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় একপর্যায়ে তারা পিছু হটে। মিছিলটি বাজারের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শেষ হয়। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

শুধু মিছিলই নয়, নোয়াখালীতে ছাত্রলীগের লাঠি মিছিল এবং পরবর্তীতে ঘোষণা দিয়ে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় সরকারপ্রধান তারেক রহমান অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে দুর্বলতা এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় কারও গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, নোয়াখালীর ঘটনার পর সরকার ঝটিকা মিছিল ও নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রমের বিষয়ে আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।

এদিকে লালমনিরহাটে রেলওয়ে কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকা এবং বুড়িমারী-পাটগ্রাম মহাসড়কে ছাত্রলীগের ব্যানারে ঝটিকা মিছিলের খবর পাওয়া গেছে। শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার তিনটি পৃথক স্থানে একই ধরনের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া গোপালগঞ্জ ও পটুয়াখালীতেও নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিলের চেষ্টা করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গণমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এসব কর্মসূচির একটি নির্দিষ্ট ধরণ রয়েছে। অধিকাংশ মিছিল খুব ভোরে অথবা জুমার নামাজের পর শুরু হয় এবং পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। অংশগ্রহণকারীরা ব্যানার প্রদর্শন, স্লোগান এবং ভিডিও ধারণের পর দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেন। পরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

পুলিশের দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই মিছিল শেষ হয়ে যায়। ফলে পরবর্তীতে ভিডিও ফুটেজ, ছবি এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করতে হচ্ছে। কয়েকটি জেলায় ইতোমধ্যে সেই ভিত্তিতে গ্রেফতার অভিযানও চালানো হয়েছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়তে থাকায় এসব ঘটনা নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিলগুলো একদিকে নিষিদ্ধ সংগঠনের কিছু কর্মী-সমর্থকের সাংগঠনিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার প্রচেষ্টা তুলে ধরছে, অন্যদিকে প্রশাসনের নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।

কুমিল্লায় ব্যাপক গ্রেফতার, চট্টগ্রামে ধারাবাহিক ঝটিকা মিছিল এবং নোয়াখালীতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক—সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন নজর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরবর্তী পদক্ষেপ এবং এসব ঘটনায় সরকারের ঘোষিত কঠোর অবস্থানের বাস্তব প্রয়োগের দিকে।