ডিডব্লিউপি বেনিফিট: কোটি পাউন্ডের ‘অদৃশ্য সহায়তা’ কি হারিয়ে যাচ্ছে ব্রিটেনের দরিদ্রদের হাত থেকে?
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১২ এপ্রিল:
লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারে আবারও আলোচনায় এসেছে যুক্তরাজ্যের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা—বিশেষ করে ডিপার্টমেন্ট ফর ওয়ার্ক অ্যান্ড পেনশনস (DWP) এর সুবিধা ও তার পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতা। সংসদীয় কমিটির সাম্প্রতিক এক আলোচনায় উঠে এসেছে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা—প্রতি বছর প্রায় ২৪ বিলিয়ন পাউন্ডের সমপরিমাণ বেনিফিট দাবি ছাড়াই থেকে যাচ্ছে।
অর্থাৎ, সরকারের দেওয়া সহায়তার বড় একটি অংশ পৌঁছাচ্ছে না সেই মানুষদের কাছে, যাদের জন্যই এই ব্যবস্থার সৃষ্টি।
এই প্রেক্ষাপটে আবারও সামনে এসেছে “ইনকাম ম্যাক্সিমাইজেশন”—একটি ধারণা, যার মূল লক্ষ্য হলো নাগরিকদের প্রাপ্য সব ধরনের সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা। বর্তমান সময়ের আর্থিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের মধ্যে এই বিষয়টি এখন আর কেবল নীতিগত আলোচনা নয়, বরং বাস্তব জীবনের জরুরি প্রশ্ন।
কারা কী হারাচ্ছেন?
যুক্তরাজ্যে কাজের বয়সী নাগরিকরা সাধারণত পান Universal Credit বা Personal Independence Payment (PIP)। অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্তদের জন্য রয়েছে Pension Credit এবং Attendance Allowance।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই সুবিধাগুলো অনেকের কাছেই অজানা, আবার কেউ কেউ আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতায় পিছিয়ে পড়েন। ফলে কোটি কোটি পাউন্ডের সহায়তা সরকারি খাতেই পড়ে থাকে, মানুষের জীবনমান উন্নয়নে যার কোনো প্রভাব পড়ে না।
সংসদীয় উদ্বেগ ও নীতিগত প্রশ্ন
সম্প্রতি Treasury Committee এই বিষয়ে বিভিন্ন নীতিবিদ ও গবেষকদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। লক্ষ্য ছিল সরকারের “Financial Inclusion Strategy”—অর্থাৎ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল—বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে তা পর্যালোচনা করা।
এই আলোচনায় স্পষ্টভাবে উঠে আসে একটি বড় ঘাটতি: শুধু তথ্য প্রচার নয়, বরং ব্যক্তিগত সহায়তা ও সক্রিয় পরামর্শের অভাব।
‘হারানো বিলিয়ন’ নিয়ে উদ্বেগ
Money and Mental Health Policy Institute-এর প্রধান নির্বাহী হেলেন আন্ডি (Helen Undy) এই আলোচনায় বলেন, সবচেয়ে বড় অনুপস্থিত বিষয় হলো—প্রতি বছর যে প্রায় ২৪ বিলিয়ন পাউন্ড অদাবিকৃত বেনিফিট থেকে যাচ্ছে, সেটি নিয়ে কোনো কার্যকর কৌশল নেই।
তিনি বলেন, বিশেষ করে যাদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বা জটিল জীবন পরিস্থিতি রয়েছে, তাদের জন্য ব্যক্তিগত সহায়তা—ফোনে বা সরাসরি সাক্ষাতে—“ইনকাম ম্যাক্সিমাইজেশন” সাপোর্ট অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
তার মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়; বরং মানুষের বাস্তব জীবন পরিবর্তনের সক্ষমতা রাখে।
তথ্য থাকলেও পৌঁছায় না কেন?
ব্রিটেনে বেনিফিট ক্যালকুলেটর বা অনলাইন টুল রয়েছে, যেমন Turn2us-এর মতো প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু সমস্যা হলো, ডিজিটাল তথ্য থাকা সত্ত্বেও বহু মানুষ তা ব্যবহার করেন না বা বুঝতে পারেন না।
এছাড়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স (NI) কনট্রিবিউশন। অনেকেই জানেন না, তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় পেনশন কত হবে বা কীভাবে তা বাড়ানো সম্ভব।
বর্তমানে পূর্ণ State Pension দাঁড়িয়েছে সপ্তাহে £241.30 (ট্রিপল লক বৃদ্ধির পর)। তবে পুরো সুবিধা পেতে সাধারণত ৩৫ বছরের NI কনট্রিবিউশন প্রয়োজন হয়। না হলে আয় কমে যায়, এবং অনেকেই শেষ বয়সে আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েন।
আসল সংকট কোথায়?
এই পুরো আলোচনার ভেতরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সমস্যা কি তথ্যের অভাব, নাকি সহায়তা ব্যবস্থার দুর্বলতা?
নীতিনির্ধারকেরা বারবার “সচেতনতা বৃদ্ধির” কথা বললেও বাস্তবতা বলছে, শুধু সচেতনতা যথেষ্ট নয়। অনেক মানুষ জানেনই না তারা কোন কোন সুবিধার জন্য যোগ্য। আবার কেউ জানলেও আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতায় পিছিয়ে যান।
ফলে একটি নীরব বৈষম্য তৈরি হচ্ছে—যেখানে সহায়তা আছে, কিন্তু প্রবেশাধিকার নেই।
ব্রিটেনের কল্যাণ রাষ্ট্রব্যবস্থা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে—সাহায্য কি সত্যিই নাগরিকের কাছে পৌঁছাচ্ছে, নাকি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে?
“ইনকাম ম্যাক্সিমাইজেশন” কেবল একটি নীতিগত শব্দ নয়; এটি বাস্তবে মানুষের খাবার, বাসস্থান এবং মানসিক স্বস্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
আর যদি ২৪ বিলিয়ন পাউন্ড সত্যিই প্রতি বছর অদাবিকৃত থেকে যায়, তবে প্রশ্নটা আর কেবল অর্থনীতির নয়—এটা ন্যায্যতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রশ্ন।