তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

বহিষ্কারাদেশ নিয়ে যুক্তরাজ্যে মুক্ত জীবন কাটাচ্ছে ২০ হাজার বিদেশি অপরাধী

বহিষ্কারাদেশ নিয়ে যুক্তরাজ্যে মুক্ত জীবন কাটাচ্ছে ২০ হাজার বিদেশি অপরাধী

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৮ নভেম্বর :

যুক্তরাজ্যে অপরাধে দণ্ডিত প্রায় ২০ হাজার বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে দেশ থেকে বহিষ্কারের আদেশ রয়েছে। অথচ তাঁরা এখনো কারাগারের বাইরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মুক্তভাবে বসবাস করছেন। নতুন সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, কয়েকটি দেশের অপরাধীদের ক্ষেত্রে বহিষ্কারের হার এত কম যে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের ২০ জনের মধ্যে একজনকেও দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত পাওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বহিষ্কারের আদেশ থাকা প্রায় ২০ হাজার বিদেশি অপরাধী যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছিলেন। এ ধরনের তথ্য প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এসেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নাইজেরিয়ার ৭৭৩ জন অপরাধী বহিষ্কারের অপেক্ষায় যুক্তরাজ্যে বসবাস করছিলেন। অথচ এর আগের এক বছরে নাইজেরিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়েছে মাত্র ৩৭ জনকে। সেই হিসাবে ফেরত পাঠানোর সংখ্যা অপেক্ষমাণ অপরাধীর তুলনায় মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

জ্যামাইকার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি প্রায় একই। দেশটির ৭৭৫ জন অপরাধীর বিরুদ্ধে বহিষ্কার কার্যক্রম চলছিল। অথচ আগের এক বছরে ফেরত পাঠানো হয়েছে মাত্র ২৪ জনকে।

আলজেরিয়ার ৫৬৯ জন অপরাধী যুক্তরাজ্যে বহিষ্কারের অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁদের ক্ষেত্রে ফেরত পাঠানোর আনুমানিক হার মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশি অপরাধীদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশি অপরাধীদের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশকে দেশে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর হার তুলনামূলক বেশি। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে রোমানিয়ায় ৯৯০ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাজ্যে বহিষ্কারের অপেক্ষায় ছিলেন দেশটির ১ হাজার ৩৯৯ জন নাগরিক।

তবে প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে। ফেরত পাঠানোর সরকারি পরিসংখ্যানে কারাগার থেকে সরাসরি বহিষ্কৃত ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। ফলে মুক্ত অবস্থায় বসবাসরত অপরাধীদের প্রকৃত বহিষ্কারের হার নির্ধারণে এসব সংখ্যা সরাসরি তুলনা করা যায় না। আবার বহিষ্কারের অপেক্ষায় থাকা কিছু ব্যক্তিকে ইলেকট্রনিক নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে।

বহিষ্কারের ক্ষেত্রে আইনি আপিল, সংশ্লিষ্ট দেশের সহযোগিতার অভাব এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিও বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে সুদান, আফগানিস্তান, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ও ইরানে ফেরত পাঠানোর সংখ্যা তুলনামূলক কম। সুদানে চলমান সংঘাত এবং কার্যকর সরকারি ব্যবস্থার অভাব প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।

এদিকে ব্রিটিশ সরকারের নতুন আইনি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১২ মাসের বেশি কারাদণ্ড পাওয়া বিদেশি অপরাধীদের বহিষ্কারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এমনকি স্থগিত কারাদণ্ডের ক্ষেত্রেও এই বিধান কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলপ। তাঁর অভিযোগ, মানবাধিকার আইনের সুযোগ নিয়ে অনেক বিদেশি অপরাধী বহিষ্কার এড়িয়ে যুক্তরাজ্যে থেকে যাচ্ছেন। তাঁর দাবি, নাইজেরিয়া, জ্যামাইকা, সোমালিয়া, আলজেরিয়া, বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশগুলোর অপরাধীদের ফেরত পাঠানোর হার অত্যন্ত কম।

তিনি আরও বলেন, কনজারভেটিভ পার্টি ক্ষমতায় গেলে ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ (ইসিএইচআর) থেকে বেরিয়ে আসাসহ কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে বিদেশি অপরাধীদের বহিষ্কারের ব্যবস্থা করবে।

তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরকারের পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, যুক্তরাজ্যে কারাদণ্ড পাওয়া প্রত্যেক বিদেশি নাগরিককে যত দ্রুত সম্ভব বহিষ্কারের প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয় এবং তাঁদের ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, গত নির্বাচনের পর দুই বছরে খুনি ও ধর্ষকসহ প্রায় ১২ হাজার বিদেশি অপরাধীকে যুক্তরাজ্য থেকে ফেরত পাঠানো বা বহিষ্কার করা হয়েছে। আগের দুই বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ৪১ শতাংশ বেশি। তাদের দাবি, গত প্রায় এক দশকের মধ্যে বর্তমানে বিদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

প্রতিবেদনে এমন দুজনের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে, যাঁরা আগে অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পরও বহিষ্কৃত না হয়ে যুক্তরাজ্যে থেকে নতুন করে গুরুতর অপরাধে জড়িয়েছেন। এর মধ্যে ইরিত্রিয়া থেকে আসা রাদিয়েত মেলেস ২০১৮ সালে ধর্ষণের চেষ্টার দায়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পান। মুক্তির পর তাঁকে যথাযথ নজরদারিতে না রাখার অভিযোগ রয়েছে। পরে তিনি আবার এক নারীকে ধর্ষণ ও মারধরের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হন।

অন্যদিকে নাইজেরিয়ার গিফট ওলাদেলে চলতি বছরের এপ্রিলে এক তরুণীকে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের দায়ে ১৭ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন। এর আগেও তিনি যৌন অপরাধে কারাদণ্ড ভোগ করেছিলেন। প্রথম দণ্ডের পর তাঁকে বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও মানবাধিকারের যুক্তিতে আপিল করে তিনি তা ঠেকাতে সক্ষম হন।

বিশ্লেষকদের কাছে এই পরিসংখ্যান যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ দমন এবং বহিষ্কার কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। একই সঙ্গে অপরাধীর ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও আইনের শাসনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও সামনে এসেছে।