ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৪৮ ।। লেবারের অধীনে ব্রিটেন কেমন আছে?

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৪৮ ।। লেবারের অধীনে ব্রিটেন কেমন আছে?

উৎসর্গ

ব্রিটেনের নীরব নাগরিকদের—
যারা প্রতিশ্রুতি শোনেন, কর দেন,
আর প্রতিদিনের জীবনে তার ফলাফল খুঁজে ফেরেন।

ব্রিটেন কি লেবার সরকারের অধীনে ভালো আছে? প্রশ্নটি এখন আর শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রশ্ন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কিয়ার স্টারমার ‘বিশৃঙ্খলার অবসান’ এবং ব্রিটেনকে ‘জাতীয় পুনর্গঠনের দশকে’ নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। দুই বছর পর ২০ জুলাই ২০২৬ তিনি পদত্যাগ করেছেন এবং তাঁর জায়গায় এসেছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। ফলে এখন হিসাব করার সময়—প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে?

অভিবাসন, আয়, আবাসন, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, অপরাধ, পরিবহন ও পরিবেশ—এই কয়েকটি সূচক বিশ্লেষণ করলে ব্রিটেনের একটি মিশ্র ছবি ফুটে উঠে। কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে সেই উন্নতির ছাপ এখনও খুব স্পষ্ট নয়। কারণ সরকার অর্থনীতির সাফল্য মাপে GDP দিয়ে, আর মানুষ মাপে মাস শেষে হাতে থাকা টাকা দিয়ে। ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি সমন্বিত গড় সাপ্তাহিক মজুরি ০.৮ শতাংশ বেড়েছে। এটি ইতিবাচক, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমানোর জন্য যথেষ্ট কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

আবাসন সংকটেও বড় পরিবর্তন আসেনি। লেবার পাঁচ বছরে ১৫ লাখ নতুন বাড়ি নির্মাণের লক্ষ্য নিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে ইংল্যান্ডে আবাসন-স্টকে যুক্ত হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার বাড়ি—লক্ষ্যের তুলনায় অনেক কম। ফলে তরুণদের বাড়ি কেনা, ভাড়াটিয়াদের চাপ এবং সামাজিক আবাসনের সংকট এখনও রয়ে গেছে।

NHS-এর অবস্থা আরও উদ্বেগজনক। A&E-তে আসা ৯৫ শতাংশ রোগীকে চার ঘণ্টার মধ্যে দেখার লক্ষ্য বহু বছর ধরে পূরণ হয়নি। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে বড় A&E বিভাগে আসা প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ রোগীর মাত্র ৬১ শতাংশকে চার ঘণ্টার মধ্যে দেখা হয়েছে। বর্তমান গতিতে চললে ৯৫ শতাংশের লক্ষ্যে পৌঁছাতে ২০৫৫ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সরকারের কাছে এটি একটি পরিসংখ্যান, কিন্তু রোগীর কাছে এটি হাসপাতালের দরজায় দীর্ঘ অপেক্ষা।

জ্বালানি বিলও সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। সমীক্ষায় অর্ধেকের বেশি মানুষ বলেছেন, জ্বালানি দাম কমলে লেবারকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। আন্তর্জাতিক সংঘাত ও বাজারের অস্থিরতা ভবিষ্যতে সেই চাপ আরও বাড়াতে পারে। মানুষ তাই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতির পাশাপাশি খুব সরল একটি উত্তর চায়—বিল কতটা কমবে?

অভিবাসনের ক্ষেত্রে সরকার কিছুটা অগ্রগতি দেখাতে পারে। ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে ছোট নৌকায় অভিবাসন বন্ধে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার ও ফ্রান্সের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো হয়েছে। তবু ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত এক বছরে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ ছোট নৌকায় ব্রিটেনে এসেছে। লেবার ক্ষমতায় আসার সময়ের তুলনায় কমেছে মাত্র ৪ শতাংশ। অর্থাৎ উন্নতি আছে, কিন্তু নাটকীয় নয়। আর অভিবাসন এখন শুধু সীমান্তের প্রশ্ন নয়; আবাসন, সরকারি সেবা ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গেও তা জড়িয়ে আছে।

অপরাধের চিত্রও দ্বিমুখী। গত তিন দশকে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে অপরাধ প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কমেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক জাতীয় জরিপে বছরে ৪৪ লাখ অপরাধের ঘটনা পাওয়া গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি। লেবার ছুরি হামলা, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও অ্যান্টি-সোশ্যাল বিহেভিয়ার কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু মানুষের কাছে জাতীয় পরিসংখ্যানের চেয়ে নিজের এলাকার নিরাপত্তাবোধ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রিটেনের রাস্তার pothole বা গর্তও এখন রাজনৈতিক প্রশ্ন। সরকার গর্ত মেরামতে ১.৬ বিলিয়ন পাউন্ড দিয়েছে। কিন্তু শিল্পখাতের হিসাবে পুরোনো ঘাটতি পূরণে প্রয়োজন প্রায় দশগুণ অর্থ। AA-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে প্রতি মাসে গড়ে ৫৪ হাজার গাড়ি pothole-এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—আগের বছরের তুলনায় ৬ শতাংশ বেশি। বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চেয়েও অনেক সময় একটি রাস্তার গর্ত নাগরিকের কাছে সরকারের কার্যকারিতা বেশি স্পষ্ট করে।

পরিবেশে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত বছর sewage spill ৩৫ শতাংশ কমে প্রতি storm overflow-তে গড়ে ২০টিতে নেমেছে। কিন্তু সংখ্যাটি এখনও অনেক বেশি। ব্রিটিশ মানুষের কাছে পরিবেশ এখন শুধু net zero-এর প্রশ্ন নয়; নদী, সমুদ্র ও পানির নিরাপত্তাও তার অংশ।

সব মিলিয়ে বলা যায়, লেবারের অধীনে ব্রিটেন পুরোপুরি খারাপ করছে না, কিন্তু মানুষের প্রত্যাশার তুলনায় যথেষ্ট ভালোও করছে না। মজুরি বেড়েছে, sewage spill কমেছে, ছোট নৌকায় অভিবাসনও সামান্য কমেছে। কিন্তু আবাসন, NHS, জ্বালানি, অপরাধ ও সড়ক ব্যবস্থার সংকট এখনও মানুষের জীবনে স্পষ্ট।

স্টারমার সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ও পরিবর্তনের বাস্তব ফলাফলের মধ্যে দূরত্ব। একজন সরকার GDP, বিনিয়োগ বা নীতির সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপতে পারে; কিন্তু ভোটার মাপেন বেতন, বাড়িভাড়া, হাসপাতালের অপেক্ষা, বিদ্যুতের বিল, রাস্তার অবস্থা ও নিরাপত্তা দিয়ে।

অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এখন সেই পরীক্ষার মুখোমুখি। তাঁর সামনে তাই বড় স্লোগানের চেয়ে বড় প্রয়োজন দৃশ্যমান ফলাফল। কারণ ব্রিটিশ ভোটার প্রতিশ্রুতি অনেক শুনেছেন; এখন তিনি ফল দেখতে চান।

শেষ পর্যন্ত একটি সরকারের সাফল্য ডাউনিং স্ট্রিটের বক্তৃতায় নয়, মানুষের সংসারে মাপা হয়। সেই পরীক্ষায় স্টারমার সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ নয়, আবার সফলও নয়। তাই প্রশ্নটি এখনও প্রাসঙ্গিক—লেবারের অধীনে ব্রিটেন কেমন আছে? উত্তর খুঁজতে হলে সংসদের দিকে নয়, মানুষের জীবনের দিকে তাকাতে হবে।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন,৯ আগস্ট, ২০২৬