‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ২৯।। এক মুঠো ভাত ।।

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ২৯।। এক মুঠো ভাত ।।

।। এক মুঠো ভাত ।। 

উৎসর্গ

ক্ষুধার কাছে যাদের শৈশব হেরে যায়,
আর এক মুঠো ভাতের জন্য যেসব ছোট্ট হাত
বইয়ের বদলে বস্তা কাঁধে তুলে নেয়—
এই গল্প সেই সব শিশুর জন্য।

কাল হয়েছে।

অন্য শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে। কারও কাঁধে স্কুল ব্যাগ। কারও হাতে বই।

আলিফের কাঁধেও একটা ব্যাগ।

তবে সেখানে বই নেই।

আছে মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল।

আলিফের বয়স ১২ বছর।

এই বয়সে তার স্কুলে যাওয়ার কথা। বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করার কথা। বিকেলে মায়ের কাছে আবদার করার কথা।

কিন্তু আলিফের মা নেই তার কাছে।

বাবা থেকেও  নেই।

বাবা হাছানুর ইসলাম ঢাকায় থাকেন। মা মরিয়ম বেগম পঞ্চগড়ে নতুন সংসার করেছেন।

আলিফ থাকে বৃদ্ধ নানা শহিদুল ইসলামের সঙ্গে।

নানার নিজেরই ঠিকমতো খাবার জোটে না। অসুস্থ শরীর নিয়ে মানুষের কাছে হাত পাতেন। যা পান, তা দিয়ে দুজনের সংসার চলে না।

একদিন আলিফ বুঝে যায়, তাকে কিছু একটা করতে হবে।

সে রাস্তায় নামে।

বোতল কুড়ায়।

দিনভর হাঁটে।

একটা বোতল পেলে বস্তায় রাখে।

আরেকটা পেলে সেটাও রাখে।

এভাবেই সন্ধ্যা নামে।

সন্ধ্যায় বোতলগুলো বিক্রি করে হাতে আসে সামান্য কিছু টাকা।

সেই টাকা নিয়ে আলিফ বাড়ি ফেরে।

নানা অপেক্ষা করেন।

আলিফ টাকা বাড়িয়ে দেয়।

—নাও নানা।

নানা টাকার দিকে তাকান।

তারপর নাতির মুখের দিকে তাকান।

—তুই কিছু খাইছিস?

আলিফ হাসে।

—হ্যাঁ।

নানা জানেন, আলিফ মিথ্যা বলছে।

সারাদিন যে শিশুটি রাস্তায় বোতল কুড়িয়েছে, তার পেটে খাবার পড়েছে কি না—নানা তা জানেন।

তবু আর কিছু বলেন না।

চোখ মুছে ফেলেন।

চুলায় হাঁড়ি বসে।

হাঁড়িতে অল্প চাল।

ভাত হয়।

দুজন পাশাপাশি বসে খায়।

সেটি কোনো উৎসবের খাবার নয়।

তবু আলিফের কাছে সেটিই পৃথিবীর সবচেয়ে দামি খাবার।

এক মুঠো ভাত।

তারপর আবার সকাল হয়।

আলিফ আবার বস্তা কাঁধে নেয়।

আবার রাস্তায় নামে।

আবার বোতল খোঁজে।

কেউ হয়তো পাশ দিয়ে যায়।

কেউ তাকায়।

কেউ হয়তো দুটো টাকা দেয়।

কেউ কিছুই দেয় না।

আলিফ থামে না।

কারণ তার থামার সুযোগ নেই।

তার পেছনে একজন বৃদ্ধ মানুষ আছেন।

তার সামনে ক্ষুধা।

আর মাঝখানে মাত্র ১২ বছরের একটি শিশু।

স্থানীয়রা বলেন, একটু সহযোগিতা পেলে আলিফ আবার স্কুলে ফিরতে পারে।

ডোমারের ইউএনও শায়লা সাঈদ তন্বী জানিয়েছেন, বিষয়টি জেনে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

হয়তো একদিন সত্যিই আলিফের কাঁধ থেকে বস্তাটা নেমে যাবে।

তার জায়গায় উঠবে স্কুলব্যাগ।

সেদিন সকালে আলিফও অন্য শিশুদের মতো স্কুলে যাবে।

নানা দরজায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকবেন।

হয়তো বলবেন—

—যা বাবা। মন দিয়ে পড়িস।

আলিফ হাঁটতে থাকবে।

পেছন ফিরে একবার তাকাবে।

তারপর হাসবে।

সেই হাসিতে হয়তো থাকবে হারিয়ে যাওয়া একটি শৈশব ফিরে পাওয়ার আনন্দ।

কিন্তু সেই দিন আসার আগ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকেই যায়—

এক মুঠো ভাতের জন্য একটি শিশুকে কেন প্লাস্টিকের বোতল কুড়াতে হয়?

কেন তার হাতে বইয়ের বদলে বস্তা থাকে?

কেন তার বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বড় হয় ক্ষুধা, দায়িত্ব আর অভাব?

আলিফ শুধু একটি শিশু নয়।

সে আমাদের সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রশ্ন।

আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ—

একটি শিশুর হাতে বস্তা নয়, বই তুলে দিতে হবে।

কারণ শিশুর শৈশব ভিক্ষা করে পাওয়া যায় না।

শৈশব ফিরিয়ে দিতে হয়।

এই আলিফরা কি কখনো ফিরে পাবে তাদের হারানো শৈশব?

লন্ডন, ৯ আগস্ট ২০২৬