তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

বিমান কিনতে ৩১,৫০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা, দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে ৬ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি !

বিমান কিনতে ৩১,৫০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা, দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে ৬ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি !

নিজস্ব প্রতিবেদক, ৭ অক্টোবর :


বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন ধীরগতি, মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের সংকটে চাপে রয়েছে এবং বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলছে, প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ বড় কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারেন, ঠিক সেই সময়ে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর বড় করার জন্য ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা সামনে এসেছে।

এর মধ্যে বুধবার ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি বিমান কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। চুক্তিতে রয়েছে চারটি দীর্ঘপাল্লার এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও উড়োজাহাজ। এর আগে মার্কিন নির্মাতা বোয়িংয়ের সঙ্গে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে। ফলে বিমানের দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়পরিকল্পনায় মোট নতুন উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৫।

হিসাবটি কত বড়?

বোয়িংয়ের ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার মোট ব্যয় প্রায় ৬৪০ কোটি মার্কিন ডলার। এই হিসাবে প্রতি উড়োজাহাজের গড় মূল্য প্রায় ২৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার। একই গড় মূল্য ধরে ১০টি এয়ারবাসের আনুমানিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২৫৬ কোটি ডলার।

৭ অক্টোবরের বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার রেফারেন্স রেট ১২৩.০৬৪ টাকা ধরে এই হিসাব প্রায় ৩১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

তবে এটি এয়ারবাসের চুক্তির প্রকৃত মূল্য নয়—বোয়িংয়ের গড় ব্যয় ধরে করা একটি আনুমানিক হিসাব। আজকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজের সম্ভাব্য চুক্তিমূল্য প্রায় ২০০ কোটি ডলার বলা হয়েছে। এয়ারবাসের আগের প্রকাশিত ২০১৮ সালের তালিকামূল্য অনুযায়ী একই ১০টি বিমানের মূল্য ছিল প্রায় ২০৫ কোটি ডলার। তবে আলোচনার সময় বাংলাদেশকে তালিকামূল্যের চেয়ে কম দামে বিমান দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অর্থাৎ ৩১,৫০০ কোটি টাকা হলো তুলনামূলক হিসাব, এয়ারবাসকে দেওয়া চূড়ান্ত অর্থের ঘোষণা নয়।

একসঙ্গে ৩৫টি বিমান কেন?

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজের বহর পরিচালনা করছে। তবে এর মধ্যে দুটি উড়োজাহাজ শিগগিরই গ্রাউন্ডেড হওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে বলে বিমানমন্ত্রী জানিয়েছেন। ফলে বাস্তবে পরিচালনাযোগ্য বিমান আরও কম। একই সঙ্গে বর্তমান বহরের বড় অংশ আগামী এক দশকে বদলানোর প্রয়োজন হবে।

সরকারের যুক্তি হলো, নতুন বিমান অর্ডার করে হাতে পেতে বহু বছর সময় লাগে। তাই পুরোনো বিমান পুরোপুরি অচল হয়ে যাওয়ার পর অর্ডার দিলে নতুন বিমান পাওয়ার সময় আরও পিছিয়ে যাবে। দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা, রুটের আয় এবং বিমানের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করেই এই ক্রয়পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে।

এয়ারবাসের বিমান কবে আসবে?

এয়ারবাসের ১০টি বিমানের সরবরাহ ২০৩৩ সাল থেকে শুরু হওয়ার কথা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সরবরাহ ২০৩৫ থেকে ২০৩৬ বা ২০৩৭ সাল পর্যন্ত চলতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ আজ চুক্তি হলেও আগামী কয়েক বছর এসব বিমান বাংলাদেশের আকাশে দেখা যাবে না।

বোয়িংয়ের ২৫টি বিমানের ক্ষেত্রে বর্তমান সরবরাহসূচি অনুযায়ী প্রথম বিমান আসার কথা ২০৩১ সালের নভেম্বর থেকে এবং সরবরাহ ২০৩৫ সাল পর্যন্ত চলবে। তবে বাংলাদেশ সরকার অন্তত একটি বোয়িং ২০২৭ বা ২০২৮ সালের মধ্যে পাওয়ার অনুরোধ করেছে। সেটি এখনো নিশ্চিত সরবরাহসূচি নয়।

এত বিমান চালাবে কোথায়?

৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ শুধু বহরে যোগ করলেই হবে না; সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজন পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, হ্যাঙ্গার, পার্কিং ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত রুট।

বিমান কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন বহরের ১৯টি উড়োজাহাজ দীর্ঘপাল্লার এবং ১৬টি আঞ্চলিক ও মাঝারি দূরত্বের রুটে ব্যবহারের কথা। এতে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এবং ভবিষ্যতে নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

এখনই অবশ্য নতুন ৩৫টি বিমান রাখার জন্য আলাদা করে সব অবকাঠামো প্রস্তুত হয়ে গেছে—এমন দাবি করা যাচ্ছে না। নতুন বিমান আসার আগেই বিমানবন্দর, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনবলের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

প্রবাসীদের জন্য এর অর্থ কী?

যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নতুন বিমান এলে লন্ডন-ঢাকাসহ আন্তর্জাতিক রুটে সেবা কতটা উন্নত হবে?

বিমানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমানে বিদেশি এয়ারলাইনগুলো বাংলাদেশের যাত্রী চাহিদার বড় অংশ বহন করছে। বিমানের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে দেশের নিজস্ব এয়ারলাইন আরও বেশি যাত্রী বহন করতে পারবে এবং যাত্রীদের ব্যয় দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পরিবর্তে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতেই রাখার সুযোগ বাড়বে।

বড় ও আধুনিক বিমান বহরে এলে দীর্ঘপাল্লার রুটে ফ্লাইট বাড়ানো, নতুন গন্তব্য চালু করা এবং পুরোনো বিমান প্রতিস্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে। তবে নতুন বিমান মানেই লন্ডন-ঢাকা টিকিটের দাম কমবে—এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই। ভাড়া নির্ভর করবে জ্বালানি, পরিচালন ব্যয়, যাত্রী চাহিদা, প্রতিযোগিতা ও আসন ব্যবস্থাপনার ওপর।

বিশ্বব্যাংকের সতর্কতার সঙ্গে বড় প্রশ্ন

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদে বলা হয়েছে, জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২৬ অর্থবছরে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে, যেখানে ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন। সংস্থাটি বলছে, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, কম রাজস্ব আদায় ও মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে অবস্থান করছেন এবং কোনো বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা এলে তাদের একটি বড় অংশ দারিদ্র্যে চলে যেতে পারেন। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক এখনো কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

অন্যদিকে সরকার বলছে, বিমান বাংলাদেশের বহর আধুনিক করা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক প্রয়োজন। উড়োজাহাজ কেনার অর্থ একসঙ্গে পরিশোধ করা হবে না; বিমান সরবরাহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থ পরিশোধ ও অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হবে। সরকারের দাবি, পরিকল্পনাটি বিমানের ভবিষ্যৎ আয়, রুটের সম্ভাবনা ও আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করেই করা হয়েছে।

ফলে প্রশ্নটি শুধু বিমান কেনা হবে কি না—তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো, এত বড় বিনিয়োগ থেকে বাংলাদেশ কতটা বাণিজ্যিক লাভ করতে পারবে, প্রবাসী যাত্রীরা কতটা উন্নত সেবা পাবেন এবং এই সম্প্রসারণ দেশের অর্থনীতিতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

বিশ্বব্যাংক একই সময়ে দ্রুত ব্যাংকিং, জ্বালানি ও রাজস্ব সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, অর্থনীতিকে আবার অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে নিতে হলে সংস্কারের গতি বাড়ানো এবং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া জরুরি।

একদিকে কোটি কোটি মানুষের দারিদ্র্যে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি, অন্যদিকে জাতীয় বিমান সংস্থার ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ—দুটি বাস্তবতাকেই এখন অর্থনৈতিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে সামলাতে হবে।