“যেখানে সময়ের শব্দে উঠে আসে সত্য”

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৭৫।। ট্রাম্প-নেতানিয়াহু: একই বৃন্তে দুটি ফুল, দুই নেতার একই ভুল!

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৭৫।। ট্রাম্প-নেতানিয়াহু: একই বৃন্তে দুটি ফুল, দুই নেতার একই ভুল!

উৎসর্গ


যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সেই সব সচেতন ভোটারের প্রতি,

যাঁরা ব্যালটের মাধ্যমে ক্ষমতার দম্ভ, বিতর্কিত নীতি ও রাজনৈতিক ভুলের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছেন।

বিশ্ব রাজনীতির দুই আলোচিত চরিত্র ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একজন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, অন্যজন ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রধান মুখ। দেশ, সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা হলেও তাঁদের নেতৃত্বের ধরনে কিছু আশ্চর্য মিল রয়েছে। দুজনই নিরাপত্তা, যুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ ও শক্তির রাজনীতিকে সামনে রেখে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চেয়েছেন। কিন্তু রাজনীতির কঠিন বাস্তবতা হলো, ক্ষমতার সমীকরণে জনগণের অসন্তোষ, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক ভুলের হিসাব একসময় সামনে আসেই।

ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটও ইসরায়েলের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। দুজনের কেউই অবশ্য এই মুহূর্তে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেননি। কিন্তু তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান যে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রশ্ন হলো, দুই নেতার এই রাজনৈতিক ধাক্কার পেছনে কি একই ধরনের ভুল কাজ করেছে?

২০২৬ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ১২০ আসনের নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পায়নি। তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্রদের একাংশও এবার সমর্থন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে।

তবে দুটি ঘটনাকে একই ধরনের চূড়ান্ত ক্ষমতাচ্যুতি বলা যাবে না। ট্রাম্প এখনো প্রেসিডেন্ট। নেতানিয়াহুও তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্রেটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন; ইসরায়েলে এখনো সরকার গঠনের লড়াই চলছে। অর্থাৎ, একজন নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়েছেন, অন্যজন সরকার গঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার কঠিন পরীক্ষায় রয়েছেন।

কিন্তু তাঁদের রাজনৈতিক সংকটের পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল পাওয়া যায়।

যুদ্ধের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত ঘরের দরজায় ফেরে

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম বড় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল আমেরিকাকে নতুন বিদেশি যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত রাখা। অথচ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ তাঁর প্রশাসনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বোঝাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।

যুদ্ধের ব্যয় শুধু সামরিক বাজেটের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে জ্বালানি বাজার, পরিবহন, পণ্যের উৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে তার অভিঘাত হাজার মাইল দূরের আমেরিকান পরিবারের জ্বালানি বিলেও পৌঁছে যায়।

এখানেই ট্রাম্পের রাজনৈতিক সমস্যার একটি বড় দিক। তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তি প্রদর্শনকে নেতৃত্বের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু ভোটারের কাছে নেতৃত্বের মূল্যায়ন হয় অনেক বেশি বাস্তব অভিজ্ঞতায়—বাজারে কত টাকা খরচ হচ্ছে, বাড়িভাড়া দেওয়া যাচ্ছে কি না, জ্বালানির দাম কত, চাকরির নিরাপত্তা আছে কি না।

রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের নির্বাচনী বিশ্লেষণে জীবনযাত্রার ব্যয়, ইরান যুদ্ধ এবং প্রশাসন নিয়ে অসন্তোষকে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, বিদেশের যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রেও যুদ্ধের রাজনীতি একই সঙ্গে শক্তি ও দুর্বলতার উৎস। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েল গাজায় দীর্ঘ সামরিক অভিযান চালিয়েছে। পরে লেবানন ও ইরানকে ঘিরেও সংঘাত বিস্তৃত হয়েছে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রে থাকলেও দীর্ঘ যুদ্ধের মূল্য, নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাঁর নেতৃত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: যুদ্ধের সামরিক সাফল্য কি রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দিতে পারে?

যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো লক্ষ্য অর্জন করা আর নাগরিকদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। সামরিক অভিযান সফল হলেও জিম্মিদের প্রত্যাবর্তন, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, পুনর্গঠন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত না হলে যুদ্ধের সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

নেতানিয়াহুর সংকটের একটি বড় জায়গা এখানেই। নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি তাঁর রাজনীতির প্রধান ভিত্তি হলেও সেই নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

অর্থনীতি: ভোটারের কাছে যুদ্ধের চেয়ে রুটির দাম বড়

রাজনীতিবিদদের একটি সাধারণ ভুল হলো, তাঁরা মনে করেন জাতীয় নিরাপত্তা, দেশপ্রেম ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের স্লোগান দিয়ে অর্থনৈতিক অসন্তোষকে দীর্ঘদিন চাপা রাখা যায়। বাস্তবে তা হয় না।

ট্রাম্পের শুল্কনীতি এর একটি উদাহরণ। বিদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে তিনি আমেরিকান শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু আমদানিনির্ভর ব্যবসা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সাধারণ ভোক্তার ওপর এর খরচ পড়েছে। শুল্কের অর্থ শেষ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে যে সাধারণ মানুষকে অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল, তাঁরাই বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়েছেন।

নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য কম নয়। দীর্ঘ সামরিক সংঘাত, নিরাপত্তা ব্যয়, রিজার্ভ সেনাদের দীর্ঘদিন কাজে রাখা, পর্যটন ও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা—সবকিছুই ইসরায়েলের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করে। যুদ্ধের সময় নাগরিকেরা নিরাপত্তার জন্য ত্যাগ স্বীকার করেন। কিন্তু সেই ত্যাগের শেষ কোথায়, তার উত্তর না পেলে অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। আমেরিকার ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্য ছিল। ইসরায়েলে নিরাপত্তা, ৭ অক্টোবরের হামলার দায়, সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক সেবা এবং ধর্মীয়-রাজনৈতিক বিভাজনও নির্বাচনী সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অর্থাৎ, দুই দেশের ভোটারদের সমস্যা এক নয়; কিন্তু শাসকদের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার প্রবণতা একই।

ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহির সংকট

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর রাজনীতির আরেকটি মিল হলো, দুজনই নিজেদের নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সমর্থন সংগঠিত করেছেন। তাঁদের সমর্থকদের কাছে তাঁরা শুধু দলের নেতা নন, বরং একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতীক।

ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সেটি মাগা আন্দোলন। নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা, ডানপন্থি জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয়-রাজনৈতিক জোটের ওপর নির্ভরশীল নেতৃত্ব।

কিন্তু ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির একটি বিপদ আছে। নেতা যখন নিজের সিদ্ধান্তকেই রাষ্ট্রের স্বার্থের সমার্থক ভাবতে শুরু করেন, তখন ভিন্নমতকে অনেক সময় রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। এতে প্রশাসনের ভুল সংশোধনের সুযোগ কমে যায়।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। তাঁর দুর্নীতির মামলাও বিচারাধীন। সামরিক বাহিনীতে অতি-রক্ষণশীল ইহুদি পুরুষদের বাধ্যতামূলক সেবার প্রশ্নে তাঁর জোটের ভেতরেও বিরোধ তৈরি হয়েছে। ইউনাইটেড তোরা জুডাইজমের সমর্থন প্রত্যাহারের পেছনে এই সামরিক সেবা-সংক্রান্ত বিরোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক জবাবদিহি, ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

এখানে মূল বিষয় হলো, গণতন্ত্রে নির্বাচিত হওয়া মানেই সব সিদ্ধান্তের জন্য সীমাহীন অনুমতি পাওয়া নয়। নির্বাচন সরকার গঠনের অধিকার দেয়, কিন্তু জবাবদিহি থেকে অব্যাহতি দেয় না।

নেতানিয়াহুর জন্য ট্রাম্পের পরাজয় কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এই দুই নেতার রাজনৈতিক সংকটের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সংযোগ সম্ভবত এখানেই।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিদলীয় রাজনীতিতে ইসরায়েলের প্রতি শক্তিশালী সমর্থন ছিল একটি প্রতিষ্ঠিত অবস্থান। রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট—উভয় দলের বড় অংশই ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে সমর্থন করেছে। কিন্তু গাজা যুদ্ধ, ইরান সংঘাত এবং নেতানিয়াহুর নীতির কারণে সেই ঐকমত্যে পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

৫ নভেম্বরের ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান দলের মধ্যেই ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়ার পুরোনো নীতি পুনর্বিবেচনার পক্ষে সমর্থন বাড়ছে। এমনকি ট্রাম্পের নিজ দলের কিছু রাজনীতিকও ইসরায়েলনীতি ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। ট্রাম্পের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র তাঁর বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

এটি নেতানিয়াহুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ইসরায়েলের নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি।

অন্যদিকে ট্রাম্পের জন্যও বিষয়টি সহজ নয়। ইসরায়েলকে সমর্থন করার প্রশ্নটি এখন তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক শিবিরেও মতবিরোধ তৈরি করছে। অর্থাৎ, যে আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে তিনি শক্তিশালী নেতৃত্বের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন, সেটিই এখন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।

ভোটের ফল কি যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে গণরায়?

 যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ডেমোক্রেটদের বিজয়কে শুধু ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে গণভোট বলা যাবে না। জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা, শুল্কনীতি, অভিবাসন, প্রশাসনিক বিতর্ক এবং প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা—সবকিছুই ফলাফলে ভূমিকা রেখেছে।

একইভাবে ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, দেশটির সব ভোটার তাঁর যুদ্ধনীতি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দল লিকুদ একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। তাঁর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন, আর বিরোধী জোটের চারটি ইহুদি-নেতৃত্বাধীন দল পেয়েছে ৪৮টি। আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসন। ফলে সরকার গঠনের হিসাব এখনো জটিল।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্রদের একাংশও আগের মতো তাঁর পাশে নেই। অন্যদিকে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর নির্বাচনী সাফল্য ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সামনে এখন সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্ন। ১১ নভেম্বরের মধ্যে তাঁর সিদ্ধান্ত আসার কথা। কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনাও রয়েছে।

ইতিহাসের শিক্ষা: ক্ষমতা স্থায়ী নয়

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ক্ষমতার শক্তি আর জনসমর্থনের শক্তি এক জিনিস নয়।

ট্রাম্প এখনো হোয়াইট হাউসে আছেন। কিন্তু কংগ্রেসের উভয় কক্ষ ডেমোক্রেটদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় তাঁর আইন প্রণয়ন, বাজেট এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথ কঠিন হবে। নতুন কংগ্রেস তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত ও শুনানি করতে পারবে।

নেতানিয়াহুও এখনো প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তাঁর জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো এবং দীর্ঘদিনের মিত্রদের সমর্থন না পাওয়া ক্ষমতা ধরে রাখার হিসাবকে কঠিন করেছে।

দুজনেরই সামনে এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন—তাঁরা কি রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নিজেদের নীতি ও নেতৃত্বের ধরনে পরিবর্তন আনবেন, নাকি আগের পথেই এগোবেন?

আমার বিবেচনায়, এই ঘটনাগুলোকে কেবল দুই নেতার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বিশ্বরাজনীতির একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের ইঙ্গিতও বহন করে। মানুষ এখন শুধু শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; সেই শক্তির বিনিময়ে নিজের জীবনে কী পাচ্ছে, সেটিও জানতে চায়।

যে রাষ্ট্রনেতা যুদ্ধের বিজয়কে নিজের সাফল্য হিসেবে দেখান, তাঁকে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্যও বহন করতে হয়। যে নেতা জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলেন, তাঁকে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিজের সরকারের ব্যর্থতার জবাবও দিতে হয়।

রাষ্ট্র পরিচালনা আর নির্বাচনী প্রচারণা এক নয়। প্রচারণায় শত্রু দেখিয়ে সমর্থন পাওয়া যায়, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় মানুষের সমস্যার সমাধান করতে হয়।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এখানেই। জনগণ কোনো নেতাকে চিরস্থায়ী ক্ষমতার মালিক করে না। তারা দায়িত্ব দেয়, সুযোগ দেয়, আবার প্রয়োজন মনে করলে সেই দায়িত্ব সীমিতও করে দেয়।

ক্ষমতার দম্ভ যত বড়ই হোক, ব্যালটের সামনে তারও একটি সীমা আছে।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ৬ নভেম্বর, ২০২৬