‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

নেতানিয়াহুর ক্ষমতা হারানোর শঙ্কা, আইজেনকটের পক্ষে ৬৭ আইনপ্রণেতা

নেতানিয়াহুর ক্ষমতা হারানোর শঙ্কা, আইজেনকটের পক্ষে ৬৭ আইনপ্রণেতা

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৬ নভেম্বর :

ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের প্রশ্নে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ১২০ সদস্যের পার্লামেন্ট নেসেটের ৬৭ জন আইনপ্রণেতা। বিপরীতে নেতানিয়াহুর পক্ষে সুপারিশ করেছেন ৪৬ জন। 

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরামর্শ শেষে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আপত্তি ও রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকায় কার পক্ষে স্থিতিশীল সরকার গঠন সম্ভব, তা এখনো পরিষ্কার নয়। এ বিষয়ে দলীয় নেতাদের সঙ্গে আরও আলোচনা করে আগামী রোববার সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, তা ঘোষণা করবেন তিনি।

গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি ২৭টি আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হয়েছে। আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি পেয়েছে ২১টি আসন। নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন বিয়াখাদ পেয়েছে ১২টি আসন।

তবে এককভাবে বৃহত্তম দল হয়েও নেতানিয়াহু সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেননি। তাঁর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি ও ধর্মীয় জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে আইজেনকটের সঙ্গে থাকা ইহুদি-জায়নবাদী বিরোধী দলগুলোর আসন ৪৮। আরব নেতৃত্বাধীন দুটি রাজনৈতিক জোট জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম পেয়েছে রেকর্ড ১৯টি আসন। ফলে সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে আরব দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বৃহস্পতিবার আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে আইজেনকটকে সমর্থনের ঘোষণা দেয়। দলটির ১১ জন আইনপ্রণেতার সুপারিশের সঙ্গে আগে থেকেই সমর্থন জানানো রা’আমের আটজন আইনপ্রণেতার সমর্থন যুক্ত হয়েছে। ফলে আইজেনকটের পক্ষে সুপারিশকারীর সংখ্যা ৬৭-তে পৌঁছেছে।

তবে জয়েন্ট লিস্ট জানিয়েছে, তাদের এই সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে তারা সরাসরি আইজেনকটের সরকারে যোগ দেবে। প্রয়োজনে বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। দলটির নেতা আহমাদ তিবি বলেছেন, শুধু নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে আবার অল্প সময়ের মধ্যে নতুন নির্বাচন ডাকার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে তাঁরা কোনো সরকারকে সমর্থন দিতে চান না।

অন্যদিকে রা’আমের নেতা মানসুর আব্বাস আইজেনকটের সম্ভাব্য সরকারকে সমর্থনের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, আরব দল সরকারে থাকলে ইসরায়েলের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে আইজেনকটের সঙ্গে দলটির কিছু নীতিগত মতপার্থক্য রয়েছে।

আইজেনকটের সরকার গঠনের সম্ভাবনা বাড়াতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েল বেইতেনু পার্টির নেতা আভিগদর লিবারম্যান দীর্ঘদিন ধরে অতি-ধর্মীয় ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে জোটে যেতে অনাগ্রহী ছিলেন। কিন্তু নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর স্বার্থে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে তিনি আগ্রহ দেখাতে পারেন বলে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২ জানিয়েছে। এমনকি আইজেনকটের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।

নেতানিয়াহুর জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা এসেছে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের কাছ থেকে। দলটির সাতটি আসনের মধ্যে চারটির অধিকারী ডেগেল হা তোরাহ কোনো প্রার্থীর পক্ষেই সুপারিশ করেনি। হারেদি বা অতি-ধর্মীয় ইহুদি পুরুষদের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আইন পাস করতে নেতানিয়াহুর সরকার ব্যর্থ হওয়ায় তাদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছে।

এদিকে নেতানিয়াহুর দল বিরোধীদের নিয়ে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। তবে আইজেনকটের দল ইয়াশার নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছে। ফলে নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় ফেরার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

নির্বাচনের ফল নিয়ে নেতানিয়াহু ও তাঁর সমর্থকদের পক্ষ থেকে আরব দলগুলোর ভোট জালিয়াতি এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগও তোলা হয়েছিল। তবে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন তদন্তের পর জানিয়েছে, নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করার মতো কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রেসিডেন্ট হারজগও নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল গ্রহণ করেছেন।

ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট যাঁকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, তিনি প্রাথমিকভাবে ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু কোনো প্রার্থী সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে দেশটিতে আবারও সাধারণ নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় ৭ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে আরব জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও আসনসংখ্যা বৃদ্ধি এবারের নির্বাচনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক।

সব মিলিয়ে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে এবং সরকার গঠনের প্রাথমিক সমর্থনের হিসাবে আইজেনকট এগিয়ে রয়েছেন। কিন্তু আরব দলগুলোর সঙ্গে ইহুদি-জায়নবাদী বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক ও আদর্শিক দূরত্ব এবং পারস্পরিক আপত্তি কাটিয়ে কার্যকর জোট গঠন করতে না পারলে এই সুবিধা কাজে নাও আসতে পারে। আগামী রোববার প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসানের পথে ইসরায়েল কতটা এগোল।