চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন উচ্চতায়, কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদারের ঘোষণা
নিজস্ব প্রতিবেদক, ভয়েস অব পিপল:
বাংলাদেশ ও চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে এক যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করেছে। এতে রাজনৈতিক আস্থা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, শুক্রবার (২৬ জুন) বাংলাদেশ সময় রাত ৭টা ৪৫ মিনিটে দেশে ফিরে এসেছেন।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি জিয়াং-এর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২২ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত সরকারি সফরে চীন অবস্থান করেন। সফরকালে তিনি দালিয়ানে অনুষ্ঠিত নিউ চ্যাম্পিয়ন্স ২০২৬ (সামার দাভোস)-এর ১৭তম বার্ষিক সভায় অংশ নেন। এ সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি জিয়াং এবং জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
যৌথ ইশতেহারে দুই দেশ তাদের বিদ্যমান সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বকে আরও উন্নীত করে "নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ সম্প্রদায়" গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
চীন ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়ে নতুন সরকারের কার্যক্রম এবং "বাংলাদেশ সবার আগে" নীতির প্রশংসা করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ মনে করছে, চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
দুই দেশ নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের সফর, কৌশলগত সংলাপ এবং পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে '২+২ সংলাপ' চালুর সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি উভয় দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বাংলাদেশ আবারও এক-চীন নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছে, তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতাকেন্দ্রিক যেকোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করবে। জবাবে চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং নিজস্ব উন্নয়নপথ অনুসরণের অধিকারের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর আওতায় নতুন গতি আনার কথা বলা হয়েছে। শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকীকরণ, ই-কমার্স, বিনিয়োগ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা আরও বাড়ানো হবে। বাংলাদেশকে শতভাগ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়ায় চীনকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে।
যৌথ ইশতেহারে মংলা বন্দর আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও সম্মতি প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান, সৌরশক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যৌথ উদ্যোগ জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীন তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী সহায়তা দেবে এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত শেষ করতে সহযোগিতা করবে বলেও জানানো হয়েছে। এছাড়া নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা পূর্বাভাস, নদী খনন এবং পানি সম্পদ উন্নয়নে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিরক্ষা খাতে সফর, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় বৃদ্ধি এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথাও যৌথ ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গণমাধ্যম, শিক্ষা, গবেষণা, চলচ্চিত্র, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, যুব ও ক্রীড়া খাতে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুই দেশ জাতিসংঘভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। পাশাপাশি ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) অংশীদার সদস্য হওয়ার প্রচেষ্টায় চীনের সমর্থনের কথাও ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সংলাপ অব্যাহত রাখতে চীন সহযোগিতা করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সফর উপলক্ষে উন্নয়ন সহযোগিতা, কৃষি, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য চীন সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং সুবিধাজনক সময়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।