চুল কাটাতে গিয়ে বেঁচে গেলেন হাবিবুর

রিয়াদে আগুনে প্রাণ গেল ১৬ বাংলাদেশির

রিয়াদে আগুনে প্রাণ গেল ১৬ বাংলাদেশির

ভয়েস অব পিপল নিউজ, ১১ আগস্ট:

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হয়েছেন। একই কারখানায় কাজ করা ১৭তম বাংলাদেশি কর্মী হাবিবুর রহমান ওই সময় চুল কাটাতে বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে গেছেন।

রোববার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার দিকে রিয়াদের শিফা থানার আওতাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।

বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটিতে মোট ১৭ জন বাংলাদেশি কর্মী কাজ করতেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় তাদের ১৬ জনই ভেতরে ছিলেন। আগুনে তারা সবাই ঘটনাস্থলে মারা যান। নিহতদের মধ্যে আটজন সরাসরি আগুনে পুড়ে এবং অপর আটজন ঘন কালো ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে মারা যান বলে স্থানীয় সিভিল ডিফেন্সের বরাত দিয়ে জানিয়েছে দূতাবাস।

সেলুনে যাওয়াই বদলে দিল হাবিবুরের ভাগ্য

ঘটনার সময় হাবিবুর রহমান ছিলেন কারখানার বাইরে। বাংলাদেশ দূতাবাসকে দেওয়া তথ্যে তিনি জানান, দুপুর আনুমানিক সাড়ে ১টার দিকে তিনি কাছের একটি সেলুনে চুল কাটাতে যান। সেখান থেকে ফিরে এসে দেখতে পান, তার কর্মস্থল আগুনে জ্বলছে।

রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সেলর মুহাম্মদ রেজায়ে রাব্বী হাবিবুরের কাছ থেকে এ তথ্য জানতে পারেন। পরে হাবিবুর নিজেও গণমাধ্যমকে জানান, কারখানায় আগুন লাগার খবর পেয়ে তিনি সেখানে ফিরে যান। তখন পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছিলেন।

মাত্র কিছুক্ষণ আগে তিনি যদি কারখানায় ফিরে আসতেন, তাহলে তার ভাগ্যও অন্য ১৬ জনের মতো হতে পারত। সহকর্মীদের হারানোর পর বর্তমানে তিনি এক বন্ধুর বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

আগুনের পাশাপাশি ধোঁয়াই হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদ

নিহতদের সবাই কারখানার একটি অংশে থাকতেন। অর্থাৎ তাদের কর্মস্থলই ছিল অনেকটা থাকার জায়গা। ফলে আগুন ছড়িয়ে পড়ার সময় তারা একই স্থানে আটকা পড়ে যান।

স্থানীয় সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, আটজন আগুনে পুড়ে মারা যান। আরও আটজনের মৃত্যু হয় কালো ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে না পেরে।

বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের পাসপোর্ট ও ইকামাসহ পরিচয়পত্রগুলোও পুড়ে গেছে। ফলে মৃতদেহ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে প্রথমে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে ডিএনএ পরীক্ষা করা হতে পারে।

সৌদি পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ফয়সাল আলউতাইবি জানিয়েছেন, পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মৃতদের মৃত্যু সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে।

রোববার রাত ১১টায় শেষ হয় উদ্ধার অভিযান

অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় সৌদি ফায়ার সার্ভিস। বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থলে যান। স্থানীয় সময় রোববার রাত ১১টার দিকে উদ্ধার অভিযান শেষ হয়। সেখান থেকে মোট ১৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

দূতাবাস জানিয়েছে, নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে তারা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।

পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর মৃতদেহ সৌদি আরবে দাফন করা হবে, নাকি বাংলাদেশে পাঠানো হবে—সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে নিহতদের পরিবারের লিখিত মতামতের ভিত্তিতে।

১৬ জনের ১৩ জনই নওগাঁর আত্রাইয়ের

এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়। দূতাবাস ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ১৬ জনের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি আত্রাইয়ে। আরও দুজন নাটোরের নলডাঙ্গার এবং একজন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বাসিন্দা।

স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আত্রাইয়ের নিহতদের মধ্যে আছেন উজনপই গ্রামের ফরিদ; ডুবাই গ্রামের শুভ ও সুমন; গন্ডগোহালী গ্রামের রুবেল প্রামাণিক, কলিমউদ্দিন, মোহন ও সুমন; একই উপজেলার মিনহাজ; বোয়ালা গ্রামের হৃদয়; নওগাঁ গ্রামের শাহিন; খরস্রোতা গ্রামের আব্দুল জলিল ও মজিদুল এবং সাদনগর গ্রামের সাগর।

নাটোরের নলডাঙ্গার নিহত দুজন হলেন দিঘীরপাড় গ্রামের শামিম এবং খাজুরা গ্রামের সাকিব। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মরুগ্রামের শ্যামলও এই ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

তবে এই নামগুলোর কিছু এখনো সরকারি পরিচয় শনাক্তকরণের চূড়ান্ত তালিকা হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন প্রতিবেদনে কয়েকজনের নাম ও বানানে পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাসও জানিয়েছে, পাসপোর্ট ও ইকামা পুড়ে যাওয়ায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট এবং প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা হচ্ছে।

শেষ কথাও বলতে পারেননি অনেকেই

অগ্নিকাণ্ডের পর নওগাঁর গ্রামগুলোতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহতদের কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাদের স্বজনদের শেষ সময়ের আতঙ্ক ও অসহায়ত্বের কথা উঠে এসেছে।

গন্ডগোহালী গ্রামের ২৮ বছর বয়সী মোহনের শেষ মুহূর্তের একটি ফোনকলের কথা জানিয়েছেন তার মা ময়না বেগম। আগুন লাগার পর তিনি পরিবারের সদস্যদের ফোন করে কাউকে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। তার ভাষ্য ছিল—কেন কেউ ফোন ধরছে না, সবাই কি মারা গেছে? এরপরই তিনি আর পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। মোহনের ছোট ভাই সুমনও একই অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন।

আরেক নিহত রুবেলের স্ত্রী অগ্নিকাণ্ডের মাত্র ১৫ দিন আগে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। বাবা মেয়েটিকে কোলে নেওয়ার সুযোগও পেলেন না। পরিবারের এখন একটাই আকুতি—যেভাবেই হোক প্রিয়জনের মরদেহ যেন দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

গন্ডগোহালীর আরেক বাসিন্দা কলিমউদ্দিন প্রায় নয় বছর ধরে সৌদি আরবে কাজ করছিলেন। আর মাত্র এক মাস পর দেশে ফেরার কথা ছিল তার। সেই ফেরা আর হলো না।

তদন্তে উঠছে কর্মপরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন

অগ্নিকাণ্ডের প্রাথমিক কারণ হিসেবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের কথা বলা হলেও, কারখানাটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নিহতদের এক সহকর্মীর বন্ধু দাবি করেছেন, কারখানাটিতে জানালা ছিল না এবং দরজা বাইরে থেকে বন্ধ রাখার কারণে আগুন লাগার পর ভেতরে থাকা শ্রমিকদের বের হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছিল। তবে এ দাবি এখনো সৌদি কর্তৃপক্ষের তদন্তে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। ফলে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও কারখানাটির নিরাপত্তাব্যবস্থার বিষয়ে তদন্তের ফল না আসা পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

এদিকে নওগাঁর জেলা প্রশাসন ও আত্রাই উপজেলা প্রশাসন নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও রিয়াদ দূতাবাসের সঙ্গে সমন্বয় করছে।

একটি সেলুনে যাওয়ার কারণে হাবিবুর রহমান বেঁচে গেলেন। কিন্তু কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তার ১৬ সহকর্মী হারিয়ে গেলেন চিরতরে। রিয়াদের এই অগ্নিকাণ্ড শুধু ১৬টি প্রাণ কেড়ে নেয়নি—বাংলাদেশের কয়েকটি গ্রামে রেখে গেছে ১৬টি পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা, অসমাপ্ত স্বপ্ন আর প্রিয়জনকে শেষবারের মতো ফিরে পাওয়ার আকুতি।