গ্রামে লোডশেডিং ১০ ঘণ্টা ছাড়ানোর অভিযোগ

দেশে গ্যাস-কয়লা সংকটে বিদ্যুৎ বিপর্যয়

দেশে গ্যাস-কয়লা সংকটে বিদ্যুৎ বিপর্যয়

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১১ আগস্ট:

বাংলাদেশে কয়েকদিন ধরে তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। রাজধানী ও বড় শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেশি বলে বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকেরা অভিযোগ করছেন। কোথাও কোথাও দিনে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না বলে জানা গেছে। ময়মনসিংহ অঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় গ্রাহকদের দাবি, দিনের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সময়ই বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকছে না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত গ্যাস ও কয়লার সংকট, কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি হ্রাস—এই কয়েকটি কারণে জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্যও বলছে, বিদ্যুতের ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে উঠেছে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী, রোববার বিকেল ৩টায় জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ নেমে আসে ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াটে। বিকেল ৫টার দিকে সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও ঘাটতি ছিল প্রায় ২ হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট।

এর আগে গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ লোডশেডিং প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে উঠেছিল। চলতি সপ্তাহেও বিকেল থেকে রাতের দিকে ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

গ্যাস সংকটে বড় ধাক্কা

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে। বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ রয়েছে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় একটি অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।

বর্তমান সংকটে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় অনেক নিচে নেমে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, শুধু গ্যাসের ঘাটতির কারণে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে।

গ্যাস সংকটের পেছনে সম্প্রতি আরও একটি বড় কারণ যুক্ত হয়েছে। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। টার্মিনালটি থেকে ৬ আগস্ট আংশিকভাবে সরবরাহ শুরু হলেও পুরো সক্ষমতায় ফেরাতে মেরামতের কাজ চলছে।

অর্ধেকে নেমেছে আদানির বিদ্যুৎ

সংকট আরও তীব্র হয়েছে ভারতের আদানি পাওয়ার থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায়। স্বাভাবিক সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা থাকলেও রোববার বিকেলে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।

পিডিবি জানিয়েছে, আদানি কর্তৃপক্ষ কয়লা পরিবহনে সমস্যার কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। ফলে রোববার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ প্রায় ৮০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি বিদ্যুৎ পেয়েছে। পরবর্তী সময়ে সরবরাহ বাড়ার প্রত্যাশা করা হলেও এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি আরও বেড়ে যায়।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আদানির সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসার পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক কয়েকটি দেশীয় কেন্দ্রেও উৎপাদন কমেছে।

কয়লা সংকটে বন্ধ বা কমেছে কয়েকটি কেন্দ্র

আদানির পাশাপাশি বড়পুকুরিয়া, পায়রা, রামপাল, মাতারবাড়ীসহ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকট ও কারিগরি সমস্যার কারণে উৎপাদন কমেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পিডিবির হিসাবে, কয়লা সংকটসহ অন্যান্য কারণে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতেও স্বাভাবিক উৎপাদনের তুলনায় প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি এবং আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহ কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটের মতো ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে গ্রাহকদের ওপর।

শহরের চেয়ে গ্রামে ভোগান্তি বেশি

বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে গ্রাম ও মফস্বল এলাকায়। গ্রাহকদের অভিযোগ, শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে তুলনামূলক কম সময় বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হলেও গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ থাকছে না।

ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাহকেরা জানিয়েছেন, দিনে কয়েক দফায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় সব মিলিয়ে ১০ ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, একই এলাকায় একাধিক বিতরণ কোম্পানির পরিবর্তে একটি সমন্বিত বিতরণ ব্যবস্থা থাকলে সংকটের সময় বিদ্যুৎ বণ্টন আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হতো। এতে লোডশেডিংয়ের মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যেতে পারে বলে তাদের ধারণা।

তবে বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান মূলত নির্ভর করছে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি নিশ্চিত করা এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি আগের মাত্রায় ফেরার ওপর। এর আগে পর্যন্ত তীব্র গরমে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে গিয়ে লোডশেডিং অব্যাহত থাকার আশঙ্কাই বেশি।