ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ১০ ।। একজন ক্ষুধার্ত রোনালদো ও এক টুকরো মানবতা
একজন ক্ষুধার্ত রোনালদো ও এক টুকরো মানবতা
।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।
উৎসর্গ
“সেই অজানা রেস্টুরেন্টকর্মীদের উদ্দেশে, যাদের ছোট্ট মানবিকতা একদিন একটি পৃথিবীকে বদলে দিয়েছিল।”

রোনালদো ভুলে যাননি সেই নারীকে
পর্তুগালে অনেক শীত পড়েছে। ঠান্ডায় জমে যাবার বাকি শুধু। গুড়ি গুড়ি বরফ পড়তে শুরু করেছে ইতোমধ্যেই। শহরের আলো ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে। রাতও অনেক হয়ে গেছে। দোকানপাট বন্ধ। রাস্তা ফাঁকা। কিন্তু কয়েকজন কিশোর-তরুণের চোখে ঘুম নেই। তাদের পেটে ক্ষুধা।

পর্তুগালে গুড়ি গুড়ি বরফ পড়তে শুরু করেছে ইতোমধ্যেই
তাদের একজনের নাম ‘ক্রিস্টিয়ানো’।
বয়স খুব বেশি নয়। বড় কোনো স্বপ্নের কথা বললেও মানুষ হয়তো হাসবে। কারণ তার পায়ে দামি বুট নেই, পকেটে টাকা নেই, আর সামনে কোনো নিশ্চয়তা নেই। আছে শুধু ফুটবলের প্রতি এক অদ্ভুত ভালোবাসা।

ছেলেটি পরিবারের কাছ থেকে অনেক দূরে থাকে
সেই সময় সে একটি ফুটবল একাডেমিতে থাকে। একাডেমির নাম Sporting CP। ছেলেটি পরিবারের কাছ থেকে অনেক দূরে থাকে। দিনভর অনুশীলন, দৌড়ঝাঁপ, ক্লান্তি। কিন্তু সব কষ্টের মধ্যে সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল ক্ষুধা। এদিকে ঠান্ডায় প্রায় জমে যাচ্ছে সবাই। শরীরে তেমন কোন শীতের পোশাকও নেই।

দিনভর অনুশীলন, দৌড়ঝাঁপ, ক্লান্তি
অনেক রাতে সে আর তার কয়েকজন বন্ধু চুপচাপ এক রেস্টুরেন্টের পেছনের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। কোনো দাবি নয়, কোনো জোর নয়। শুধু অপেক্ষা।
ভেতরে কাজ করেন কয়েকজন নারী।
তারা জানেন, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলো চোর নয়, ভিক্ষুক নয়। তারা শুধু ক্ষুধার্ত।
কখনো একটি বার্গার, কখনো দুটো। কখনো কিছু অবিক্রীত খাবার। গোপনে সেগুলো তুলে দেন ছেলেগুলোর হাতে।
খাবারগুলো খুব বড় কিছু নয়। পৃথিবীর হিসেবে সামান্য।
কিন্তু এই শীতের রাতে ক্ষুধার্ত কিছু তরুণদের কাছে সেটাই হচ্ছে এখন ওদের পৃথিবী।
ক্রিস্টিয়ানো খাবার হাতে নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে খায়। ছেলেটি ছোটবেলা থেকেই খুবই মানবিক। এই শীতের রাতে এই বার্গগারগুলো অমৃত মনে হয় ওদের কাছে। খুশিতে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষাও যেনো হারিয়ে ফেলেছে ছেলেগুলো। হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পায় ওরা। মুখে ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা জানায় রেষ্টুরেন্টের নারীদের দলনেত্রীকে।
ঘরের পথে পা বাড়ায় ছেলের দল। আবার ওদের স্বপ্ন দেখা শুরু। একদিন বড় ফুটবলার তাঁদের হতেই হবে। হয়তো একদিন তার ও তার বন্ধুদের জীবন বদলে যাবে।
কিন্তু তখন কেউ জানত না, সেই ক্ষুধার্ত ছেলেটিই একদিন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের পরিচিত মুখ হয়ে উঠবে।
বছর কয়েক কেটে গেল।
ফুটবল মাঠে শুরু হলো এক নতুন গল্প।
গোলের পর গোল। ট্রফির পর ট্রফি। খ্যাতি, অর্থ, সম্মান—সবকিছু এসে ধরা দিল তার হাতে।
মানুষ তাকে চিনল ‘‘ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো’’ নামে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, পৃথিবী তাকে যত বড় করেছে, সে ততই ফিরে তাকিয়েছে তার ছোটবেলার দিকে।
একদিন এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেই নারীদের কথা বললেন।
বললেন, তিনি এখনও তাঁদের খুঁজছেন।
কেন?
কারণ তিনি ধন্যবাদ বলতে চান।
যে মানুষটি একদিন ক্ষুধার সময় একটি বার্গার দিয়েছিল, রোনালদো ভুলে যাননি সেই নারীকে।
সাংবাদিকরা অবাক হয়েছিলেন। পৃথিবীর অন্যতম ধনী একজন মানুষ, যার নিজের অসংখ্য বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসা আছে—তিনি খুঁজছেন কয়েকজন সাধারণ রেস্টুরেন্টকর্মীকে।
কিন্তু এটাই হয়তো মানুষ হওয়ার সবচেয়ে সুন্দর দিক।
যে উপকারের মূল্য টাকায় মাপা যায় না, সেটি হৃদয় মনে রাখে।
পরে সেই ঘটনার কথা আবার সামনে আসে। একজন নারী জানান, হ্যাঁ, তিনি সত্যিই সেই কর্মীদের একজন ছিলেন। ছোট্ট রোনালদো আর তার বন্ধুদের তিনি খাবার দিয়েছিলেন।
সম্ভবত তিনি সেদিন বুঝতেই পারেননি, যে ছেলেটির হাতে বার্গার তুলে দিচ্ছেন, সে একদিন ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে।
মানবতার সৌন্দর্য এখানেই। ভালো কাজ করার সময় ভবিষ্যৎ দেখতে হয় না।
একজন শিক্ষক জানেন না তার ছাত্র একদিন কী হবে।
একজন মা জানেন না তার সন্তানের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
একজন অপরিচিত মানুষও জানেন না, তার সামান্য সাহায্য কার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
তবু মানুষ সাহায্য করে।
কারণ সহানুভূতি কোনো বিনিয়োগ নয়, কোনো ব্যবসা নয়।
এটি মানুষের হৃদয়ের ভাষা।
রোনালদোর গল্প তাই শুধু একজন ফুটবলারের গল্প নয়। এটি ক্ষুধার গল্প, দয়ার গল্প, স্মৃতির গল্প এবং কৃতজ্ঞতার গল্প।
আজ যখন আমরা ব্যস্ত পৃথিবীতে নিজেদের নিয়েই ভাবি, তখন এই গল্পটি নিঃশব্দে একটি প্রশ্ন রেখে যায়—
হয়তো আজ আপনি যে শিশুটিকে একটি খাবার দিলেন, যে মানুষটিকে একটু সাহস দিলেন, যে হতাশ মানুষটির পাশে দাঁড়ালেন—তিনি একদিন অনেক বড় কিছু হয়ে উঠবেন।
আর যদি না-ও হন, তবু আপনার মানবিকতা বৃথা যাবে না।
কারণ পৃথিবীকে বদলে দেয় বড় বড় বক্তৃতা নয়।
অনেক সময় ছোট্ট এক টুকরো বার্গারও একটি মানবিক ইতিহাস লিখে দেয়।
লন্ডন, ২৬ জুন ২০২৬