চলে গেলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. সফিউদ্দিন আহমদ

চলে গেলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. সফিউদ্দিন আহমদ

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৬ ফেব্রুয়ারি: বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সৃজনশীল সাহিত্যিক এবং বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাবেক সভাপতি ও অধ্যাপক ড. সফিউদ্দিন আহমদ আর নেই। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) ভোর সাড়ে ৪টায় ঢাকার নয়াপল্টনে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর প্রয়ানে জাতি তার একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিককে হারালো। আমরা তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি এবং প্রার্থনা করি তিনি জান্নাতবাসী হন।

অধ্যাপক ড. সফিউদ্দিন আহমদ ১৯৪১ সালের ১৯ অক্টোবর নরসিংদী জেলার রায়পুরায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রায়পুরা আর কে আর এম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন এবং ১৯৬২ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএ পাশ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ থেকে বিএ ও এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চতর গবেষণার জন্য তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্র সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

চাকরি জীবনের শুরুতে তিনি নেত্রকোণা কলেজে অধ্যাপনা করেন। পরে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে সরকারি চাকরি নিয়ে বরিশালের বিএম কলেজ, ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ ও সিলেটের এমসি কলেজে অধ্যাপনা করেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ‘ভাষা বিজ্ঞান’ বিভাগের প্রধান হিসেবে ২০০৫ সালে অবসর গ্রহণ করেন। অতিথি অধ্যাপক হিসাবে তিনি যাদবপুর, বর্ধমান, কল্যাণী, ও ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা প্রদান করেন। ২০১০ সালে লন্ডন সফরে এলে তাঁর অগণিত ভক্ত ও ছাত্ররা মিলে তাঁকে ব্যাপকভাবে সম্মানিত করেন।

ড.শফিউদ্দিন আহমদ ছিলেন দেশের জাতীয় পুরস্কার ও সম্মাননাপ্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি জাতিসংঘ মানবাধিকার পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু সাহিত্য পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু স্মৃাত সংসদ পুরস্কার, শেরে বাংলা স্মৃতি সংসদ পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ লেখক সমিতি পুরস্কার, বিদ্যাসাগর গবেষনা পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন। গবেষণার পাশাপাশি তিনি অনেক গল্প ও কবিতা রচনা করেন। তাঁর লেখা ‘ডাক পিয়ন’ গল্প রুশ ভাষায় এবং ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ ও ‘উত্তরণ’ ফরাসি অনুদিত হয়। সাহিত্যের আড্ডা ও বৈঠকে তিনি প্রাণখোলা ও সদাহাস্য এবং নতুন প্রত্যয়ের আলোকে উদ্ভাসিত এক ব্যক্তিত্ব। 

ড. সফিউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের একজন প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২০১৬ সালে উদীচীর ২০তম জাতীয় সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়াও উদীচীর ২২তম জাতীয় সম্মেলনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি সভাপতিত্ব করেছেন।

বাংলা সাহিত্য, তুলনামূলক সমালোচনা ও বিশ্বসাহিত্যে পণ্ডিত ড. সফিউদ্দিন আহমদ প্রগতিশীল চিন্তাচেতনায় ঋদ্ধ একজন গবেষক হিসেবে পরিচিত। তাঁর গ্রন্থ ‘ভাষার সংগ্রাম-শিক্ষার সংগ্রাম’, ‘সক্রেটিসের শেষ দিনগুলো’, ‘সক্রেটিওসর জবানবন্দি ও মৃত্যুদন্ড’, ‘ডিরোজিও এবং ইয়ং বেঙ্গল মুভমেন্ট’ বাংলা গবেষণা সাহিত্যে মৌলিক অবদান হিসেবে স্বীকৃত। তিনি উনিশ শতকের রেনেসাঁ বিশ্লেষণে যুগস্রষ্টা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

বাংলা একাডেমি থেকে তাঁর ১০ গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সর্বমোট ৩৫ গবেষণামূলক গ্রন্থ রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন একজন ঋদ্ধ গবেষক। উনিশ শতক নিয়ে এত গবেষনামূলক কাজ তাঁর মতো আর কেউ করেনি।

ড. সফিউদ্দিন আহমদ স্যারের মৃত্যুতে ভয়েস অব পিপলসহ দেশ-বিদেশে অবস্থানরত অগণিত ছাত্র-ছাত্রী, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক মহল গভীরভাবে শোকাহত।