কলিকালের কলধ্বনি ।। ৮৩।। শব্দের শৃঙ্খলা: ‘হয়’, ‘হচ্ছে’, ‘হবে’, ‘জায়গা’—কখন, কেন, কীভাবে ব্যবহার করা দরকার 

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৮৩।। শব্দের শৃঙ্খলা: ‘হয়’, ‘হচ্ছে’, ‘হবে’, ‘জায়গা’—কখন, কেন, কীভাবে ব্যবহার করা দরকার 

উৎসর্গ

সাহিত্য ও সাংবাদিকতা অঙ্গনের গুরুজন – যাঁদের লেখা বা অভিজ্ঞতা আমাদের শব্দচয়ন, সংলাপ ও প্রকাশভঙ্গি সমৃদ্ধ করেছে

গত কলামে ‘কিন্তু’ শব্দ নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। লেখাটি পড়ে বেশ কয়েকজন দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সাংবাদিক বেশ সাধুবাদ জানিয়ে মেসেজ পাঠিয়ে আরও এ ধরনের কিছু শব্দ নিয়ে কলাম লেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের সকলের আগ্রহের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে আজকে আরও কিছু শব্দ নিয়ে সবাইকে জব্দ না হতে অনুরোধ জানিয়ে, এ কলামের অবতারণা করছি। সমস্যা হচ্ছে, এই ফেইসবুক আর ইউটিউবের যুগে বেশিরভাগ মানুষই পড়াশোনা করতে চায় না। সবাই এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকে সময় কাটাতে।  আর এর ফলাফল তো আমরা রোজই পাচ্ছি হাতে-কলমে। শুধু এই ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বাংলা ভাষা নিয়ে চর্চা ও সাথে সাথে সেমিনার সিম্পোজিয়াম করে কিছুটা খরচা বাড়ে আরকি। একটা মোবাইল ফোন বা মাইক্রোফন হাতে নিয়েই আজকাল দেশে-বিদেশে লাখ লাখ সাংবাদিকের ভিড়ে কতজনের ঘরে  ক’টা বইপত্র আছে, তাও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই খোঁজ খবর না নিয়েই ফেইসবুক সূত্রে তো আজকাল পৃথিবীর সবাই সাংবাদিক আর সাহিত্যিক। সুতরাং এ অবস্থায় এ জাতীয় কলাম যাঁরা মন দিয়ে পড়েন তাঁদের প্রতি ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতার সীমা পরিসীমা নেই বৈকি।

প্রসঙ্গে আসা যাক। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি চিন্তার বহি:প্রকাশও। একজন বক্তা বা লেখকের ভাষা যত পরিষ্কার, তার ভাবও তত স্বচ্ছ। কিন্তু আজকাল বক্তৃতা, টকশো, এমনকি শিক্ষামূলক আলোচনায়ও আমরা একটি প্রবণতা লক্ষ্য করি—কথায় কথায় “হয়”, “হচ্ছে”, “হবে”, “জায়গা” ইত্যাদি শব্দের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার হয়। ফলে বাক্য ভারী হয়, অর্থ ঝাপসা হয়, এবং বক্তব্যের শক্তি কমে যায়।

এই শব্দগুলো ভুল নয়—অপব্যবহারই সমস্যা। তাই প্রয়োজন সঠিক প্রেক্ষাপট বোঝা।
১. “হয়” — অভ্যাসগত ভরসা, নাকি ব্যাকরণগত প্রয়োজন?
“হয়” বাংলা ভাষায় একটি ক্রিয়া, যা সাধারণত বর্তমানকালের সাধারণ সত্য, নিয়ম বা অভ্যাস বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। যেমন:
“মানুষ ভুল করে, আবার শিখেও হয়।”
কিন্তু আমরা প্রায়ই বলি:
“এখানে একটা সমস্যা হয়।”
“আমাদের সচেতনতা বাড়ানো দরকার হয়।”
প্রথম বাক্যে “হয়” অপ্রয়োজনীয়; বলা যায়—“এখানে একটা সমস্যা আছে।”
দ্বিতীয় বাক্যে “হয়” সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক।
কখন ব্যবহার করবেন?
সার্বজনীন সত্যে
নিয়ম বা প্রক্রিয়া বোঝাতে
পরিচয় বা রূপান্তর প্রকাশে
কখন এড়িয়ে চলবেন?
যখন “আছে”, “রয়েছে”, “দরকার”, “চাই” ইত্যাদি যথাযথ বিকল্প রয়েছে
যখন বাক্য ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ
২. “হচ্ছে” — চলমানতা না কি মুখের অভ্যাস?
“হচ্ছে” বর্তমান ক্রিয়মান অবস্থা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
“কাজটি এখন করা হচ্ছে।”
কিন্তু অনেক বক্তা বলেন:
“আমরা দেখছি যে পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে যাচ্ছে।”
এখানে “হচ্ছে যাচ্ছে” অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি। একটি ক্রিয়াই যথেষ্ট।
আরও একটি বড় ভুল প্রায় শোনা যায়—
“এই কথার মানে হবে হচ্ছে…”
একই বাক্যে “হবে” (ভবিষ্যৎকাল) এবং “হচ্ছে” (বর্তমান ক্রিয়মান) একসঙ্গে ব্যবহার করা শুদ্ধ নয়। দুটি ভিন্ন কালের ক্রিয়া পাশাপাশি বসালে অর্থগত অসঙ্গতি তৈরি হয়।
সঠিক হবে:
“এই কথার মানে হচ্ছে…”
অথবা
“এই কথার মানে হবে…” (যদি ভবিষ্যৎ অর্থ বোঝানো হয়)
একই সঙ্গে দুই কালের ব্যবহার ভাষার শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে।
৩. “হবে” — ভবিষ্যৎ, সম্ভাবনা না কি শূন্য প্রতিশ্রুতি?
“হবে” ভবিষ্যৎকাল বা সম্ভাবনা নির্দেশ করে।
“আগামীকাল সভা হবে।”
“পরিশ্রম করলে সফলতা হবে।”
কিন্তু বক্তৃতায় শোনা যায়:
“উন্নয়ন হবে, পরিবর্তন হবে, সমৃদ্ধি হবে…”
অতিরিক্ত পুনরাবৃত্তি বক্তব্যকে দুর্বল করে। প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবহার করা যায়—
ঘটবে, আসবে, গড়ে উঠবে, প্রতিষ্ঠিত হবে ইত্যাদি।
ব্যবহারের নীতি:
নির্দিষ্ট সময় বা শর্ত থাকলে
বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতিতে
অনুমান বা পরিকল্পনা বোঝাতে
৪. “জায়গা” — ভৌগোলিক না কি বিমূর্ত?
“জায়গা” মূলত স্থান নির্দেশ করে।
“এই জায়গাটি সুন্দর।”
কিন্তু আমরা প্রায়ই বলি:
“উন্নতির জায়গা আছে।”
“সমালোচনার জায়গা নেই।”
এগুলো সম্পূর্ণ ভুল নয়, তবে অতিরিক্ত ব্যবহারে ভাষা একঘেয়ে হয়। বিকল্প হতে পারে—
সুযোগ, ক্ষেত্র, পরিসর, অবকাশ, দিক।
উদাহরণ:
“উন্নতির সুযোগ রয়েছে।”
“সমালোচনার অবকাশ নেই।”
বানানগত ভুল: অবহেলার ফল
শুধু কথার ভুল নয়, লেখার ভুলও ক্রমে বাড়ছে। অনেকেই “ভুল” শব্দটি লিখতে গিয়ে “ভূল” লেখেন—যা সম্পূর্ণ ভুল বানান। সঠিক বানান হলো ভুল, “ভূল” নয়।
আবার অনেকে তাড়াহুড়োয় “হবে” শব্দটি লেখেন “হবো”, “হচ্ছে” লেখেন “হচ্ছো” বা “হচ্ছেে”—এসবই অসতর্ক টাইপিংয়ের ফল। ডিজিটাল মাধ্যমে দ্রুত লেখার কারণে এই সমস্যা বাড়ছে, কিন্তু তা গ্রহণযোগ্য নয়।
কথার ভুল মুহূর্তে মিলিয়ে যায়, কিন্তু লেখার ভুল স্থায়ী ছাপ ফেলে। একজন বক্তার বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন ভাষার শুদ্ধতায়, তেমনি একজন লেখকের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে বানানের যথার্থতার ওপর।
কেন এই অপব্যবহার বাড়ছে?
১. তাৎক্ষণিক বক্তৃতায় ভাব জড়ো করার প্রবণতা
২. মিডিয়া-প্রভাবিত বাক্যরীতি
৩. শব্দভাণ্ডারের সীমাবদ্ধতা
৪. প্রস্তুতির অভাব
৫. বানান যাচাই না করা
অনেকে কথা চালিয়ে যাওয়ার জন্য “হচ্ছে”, “মানে”, “একটা জায়গা” ইত্যাদি ভরাট শব্দ ব্যবহার করেন। এগুলো ভাবের চেয়ে সময় ভরাট করে বেশি।
কীভাবে এড়াবেন?
১. বক্তব্যের আগে কাঠামো ঠিক করুন।
২. নিজের বক্তৃতা রেকর্ড করে শুনুন।
৩. সমার্থক শব্দের চর্চা বাড়ান।
৪. ছোট ও সরল বাক্য ব্যবহার করুন।
৫. একই বাক্যে দুই কালের ক্রিয়া ব্যবহার করবেন না।
৬. লেখার পর বানান যাচাই করুন—বিশেষ করে “ভুল”, “হবে”, “হচ্ছে” ইত্যাদি শব্দ।
উদাহরণ:
দুর্বল:
“আমাদের এখানে সচেতনতার একটা জায়গা তৈরি করতে হবে হচ্ছে।”
শুদ্ধ:
“আমাদের সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।”
ভাষা শক্তিশালী হয় সংযমে। “হয়”, “হচ্ছে”, “হবে”, “জায়গা”—এসব শব্দের প্রয়োজন আছে, কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার ভাষাকে ভারী করে।
মনে রাখা দরকার—অতিরিক্ত শব্দ ভাবকে আড়াল করে, সংযত শব্দ ভাবকে উজ্জ্বল করে। ভাষার শৃঙ্খলাই বক্তা ও লেখকের মর্যাদার প্রথম পরিচয়।

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক

লন্ডন, ২৬ ফেব্রুয়ারি