যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধবিরতি: অচলাবস্থার ভেতর ‘জয়ের’ বিভ্রম

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধবিরতি: অচলাবস্থার ভেতর ‘জয়ের’ বিভ্রম

লন্ডন, ৬ এপ্রিল:

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে কাগজে-কলমে শান্তি থাকলেও বাস্তবে উত্তেজনা প্রতিদিনই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দি গার্ডিয়ান-এর বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এই সংঘাত এখন এক ধরনের “স্ট্যালমেট”—অর্থাৎ কেউই চূড়ান্ত জয় অর্জন করতে পারেনি, আবার কেউই পিছু হটতেও প্রস্তুত নয়। বরং উভয় পক্ষই মনে করছে, জয় যেন হাতের নাগালেই।

এই আত্মবিশ্বাসই এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক বাস্তবতা।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে পরোক্ষ হামলা, সামরিক চাপ এবং অর্থনৈতিক অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উত্তেজনা এখনো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে রেখেছে। এই রুট দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ চলাচল করে, ফলে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে সরাসরি আঘাত হানছে।

যুদ্ধ থেমেছে শুধু নামেই

প্রাথমিকভাবে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল সরাসরি সামরিক সংঘাতে। এখন সেটি রূপ নিয়েছে দীর্ঘস্থায়ী চাপের যুদ্ধে। ইরান সীমিত পরিসরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে শক্তি প্রদর্শন করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক অবরোধ ও নৌ-নিয়ন্ত্রণ কৌশল দিয়ে ইরানকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো—দুই পক্ষই চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে না।

ইরানের অর্থনীতি ব্যাপক চাপের মধ্যে থাকলেও দেশটি ভেঙে পড়েনি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও তার ঘোষিত কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ। ফলে পরিস্থিতি এখন “জয়ও নয়, পরাজয়ও নয়”—এই অচলাবস্থায় আটকে আছে।

রাজনৈতিক বার্তা বনাম বাস্তবতা

ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় রাজধানীতেই নেতৃত্ব নিজেদের জনগণকে ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। দুই পক্ষই দাবি করছে, কৌশলগত সুবিধা তাদের দিকেই ঝুঁকছে।

কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। সময় যত গড়াচ্ছে, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ দুই দেশকেই ক্লান্ত করছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলেও কোনো পক্ষই “ক্লিন বিজয়” অর্জন করতে পারছে না।

এই অচলাবস্থার প্রভাব এখন সীমান্ত ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়ছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, তেলের দামের ওঠানামা এবং শিপিং রুটে ঝুঁকি আন্তর্জাতিক বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় চাপ হয়ে উঠতে পারে।

কূটনৈতিক আলোচনা চললেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা থাকলেও দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে অনিচ্ছুক।

ফলে বাস্তব চিত্রটা দাঁড়াচ্ছে এমন—যুদ্ধ চলছে, কিন্তু স্বীকৃত যুদ্ধ নয়; শান্তি আছে, কিন্তু কার্যকর শান্তি নয়।

এই অনিশ্চয়তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে পুরো অঞ্চল, যার ভবিষ্যৎ এখনো অস্পষ্ট।