টিকার ঘাটতিতে শিশুমৃত্যুর মিছিল: বাংলাদেশে হামের ভয়াল ছায়া, উচ্চঝুঁকির সতর্কতা

টিকার ঘাটতিতে শিশুমৃত্যুর মিছিল: বাংলাদেশে হামের ভয়াল ছায়া, উচ্চঝুঁকির সতর্কতা

ঢাকা প্রতিনিধি, ২৫ এপ্রিল:

বাংলাদেশে হামের বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক বড় সতর্ক সংকেত।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকেই সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে, আর ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ১৯ হাজার ১৬১ জন সন্দেহভাজন রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে ২ হাজার ৮৯৭ জনের হাম সংক্রমণ।

রাজধানী ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকাগুলো—ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীর চর, কড়াইল, মিরপুর ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল—এ সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব ও টিকাদানের ঘাটতি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আক্রান্তদের বড় অংশই শিশু। আক্রান্তদের ৮৩ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ৭৯ শতাংশই এই বয়সসীমার। ইতোমধ্যে ১৬৬ শিশুর সন্দেহজনক মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের বেশিরভাগই টিকাবঞ্চিত দুই বছরের কম বয়সি শিশু।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসে ছড়ায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হলো টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি। ২০২৪-২৫ সালে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার সংকট, নিয়মিত টিকাদানে বিঘ্ন এবং ২০২০ সালের পর দেশব্যাপী সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ থাকায় বিপুলসংখ্যক শিশু ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে ৪২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ১৯৮ শিশু। শুধু গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১৭২ শিশু এবং উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৬০ শিশু। একই সময়ে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার বেশিরভাগই ঢাকায়।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩৪ লাখ শিশু জন্ম নেয়, কিন্তু টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যাও প্রায় একই। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে বিপুলসংখ্যক অরক্ষিত শিশু তৈরি হয়েছে, যা বর্তমান প্রাদুর্ভাবকে তীব্র করে তুলেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সংক্রমণ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এজন্য রোগ শনাক্তকরণ জোরদার, নজরদারি বৃদ্ধি এবং অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুদের টিকার আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশজুড়ে জোরদারভাবে টিকাদান কর্মসূচি চালানো হচ্ছে এবং আগামী মাসের মধ্যে শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাস্তবতা বলছে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ একসময় হাম নির্মূলের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। কিন্তু টিকার ফাঁক, অবহেলা ও বৈষম্যের কারণে সেই অর্জন এখন ঝুঁকির মুখে। শিশুদের জীবন বাঁচাতে এখন প্রয়োজন জরুরি ও সমন্বিত উদ্যোগ—নয়তো এই প্রাদুর্ভাব আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।