বাংলাদেশে জানুয়ারিতে সড়ক-রেল-নৌপথে ৫৮৬ প্রাণহানি: প্রতিদিন গড়ে ১৯টি লাশ, থামছে না মৃত্যুর মিছিল

বাংলাদেশে জানুয়ারিতে সড়ক-রেল-নৌপথে ৫৮৬ প্রাণহানি: প্রতিদিন গড়ে ১৯টি লাশ, থামছে না মৃত্যুর মিছিল

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২৩ ফেব্রুয়ারি: 

২০২৬ সালের নতুন বছরের প্রথম মাসই যেন বাংলাদেশে হয়ে উঠল শোকের কালপঞ্জি। জানুয়ারি মাসে দেশে ৫৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৪৬ জন, আহত হয়েছেন ১ হাজার ২০৪ জন। একই সময়ে রেলপথে ৩৭টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৩ জন এবং নৌপথে ৮টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৭ জনের। সব মিলিয়ে সড়ক, রেল ও নৌ—এই তিন পথে ৫৯৭টি দুর্ঘটনায় ৫৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে; আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৩৮ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৯টি প্রাণ ঝরে গেছে।

রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতীয়, আঞ্চলিক ও অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার সংবাদ মনিটরিং করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদন বলছে, জানুয়ারিতে ২০৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২২৩ জন নিহত ও ১৩২ জন আহত হয়েছেন। যা মোট দুর্ঘটনার ৩৭.৮৬ শতাংশ এবং মোট নিহতের ৪০.৮৪ শতাংশ। অর্থাৎ সড়কে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে মোটরসাইকেল।

বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত ও ৩২৮ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে সিলেট বিভাগে সর্বনিম্ন ২৯টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ২৮ জনের, আহত হয়েছেন ৬৩ জন।

নিহত ও আহতদের পরিচয় বিশ্লেষণে উঠে এসেছে মর্মান্তিক চিত্র। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছেন ১৩১ জন চালক, ৮৯ জন পথচারী, ৭৯ জন শিক্ষার্থী, ৬২ জন নারী, ৬৭ জন শিশু ও ৫৩ জন পরিবহন শ্রমিক। নিহতদের মধ্যে ১২৭ জন চালক, ৮৯ জন পথচারী, ৫৪ জন নারী, ৪৮ জন শিশু, ৫৭ জন শিক্ষার্থী, ২১ জন পরিবহন শ্রমিক ও ৮ জন শিক্ষক রয়েছেন। প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবারে অন্ধকার নেমে আসার গল্প বহন করে।

দুর্ঘটনায় জড়িত ৮২৯টি যানবাহনের মধ্যে ২৮.৪৬ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২৩.৬৪ শতাংশ ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান-লরি, ১৪.৩৫ শতাংশ বাস, ১৩.৬৩ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক এবং ৫.৫৪ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৮.৩৬ শতাংশ ক্ষেত্রে গাড়িচাপা, ২৮.৬২ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং ১৬.৮৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে। জাতীয় মহাসড়কেই ঘটেছে ৪২.৫৭ শতাংশ দুর্ঘটনা; আঞ্চলিক মহাসড়কে ২৭.৮৯ শতাংশ এবং ফিডার সড়কে ২৪.০৯ শতাংশ।

সংগঠনটির মতে, সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় নীতিগত দুর্বলতা, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টো পথে চলাচল, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও নছিমন-করিমনের নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল এবং মহাসড়কে পর্যাপ্ত রোড সাইন ও ডিভাইডারের অভাবই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।

দুর্ঘটনা প্রতিরোধে উন্নত দেশের নীতি অনুসরণ, দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ, ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফিটনেস সনদ প্রদান, সিসিটিভির মাধ্যমে আইন প্রয়োগ, মহাসড়কে সার্ভিস লেন ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা, আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং নিয়মিত রোড সেফটি অডিট চালুর সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে শত শত পরিবারে নেমে আসা শোক, অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘশ্বাস। প্রশ্ন রয়ে যায়—আর কত প্রাণ গেলে সড়ক নিরাপদ হবে?