কলিকালের কলধ্বনি ।। ১০৭ ।। বাতাসে পাচ্ছি সর্বনাশের গন্ধ : দেশে মোবাইল নেটওয়ার্ক হতে পারে বন্ধ

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১০৭ ।। বাতাসে পাচ্ছি সর্বনাশের গন্ধ : দেশে মোবাইল নেটওয়ার্ক হতে পারে বন্ধ

উৎসর্গ

দেশে থাকা প্রিয়জনদের উদ্দেশে—
যাদের সঙ্গে দূরত্ব মুছে দেয় প্রযুক্তি,
কিন্তু সেই প্রযুক্তিই আজ অনিশ্চয়তার মুখে


বিশ্ব রাজনীতির উত্তপ্ত মঞ্চে যখন হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তখন তার অদৃশ্য প্রভাব ধীরে ধীরে বাংলাদেশের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ছে। বিষয়টি দূরের কোনো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নয়; বরং তার সরাসরি অভিঘাত পড়তে যাচ্ছে দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। একজন লন্ডনপ্রবাসী সাংবাদিক হিসেবে দূর থেকে এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে স্পষ্টই মনে হচ্ছে—একটি নীরব বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে দেশ।

বাংলাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্ক এখন আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটি অর্থনীতির প্রাণশক্তি। দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ অনলাইন ব্যবসা, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছে। এই নেটওয়ার্ক হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে, সেটি শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যাই হবে না; বরং সরাসরি অর্থনৈতিক স্থবিরতায় রূপ নেবে।

গ্রামাঞ্চলের একজন নারী উদ্যোক্তার কথাই ধরা যাক—যিনি মহামারীর সময় অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় তিনি ইতিমধ্যে বিপাকে পড়েছেন। এখন যদি নেটওয়ার্কও বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তার ব্যবসা কার্যত থেমে যাবে। একইভাবে, অ্যাপ-নির্ভর রাইড শেয়ারিং চালকদের জন্য নেটওয়ার্কই জীবনের ভিত্তি। সংযোগ বিচ্ছিন্ন মানে আয় বন্ধ, আর আয় বন্ধ মানেই পরিবারে অনিশ্চয়তা।

এই সংকটের শিকড় খুঁজতে গেলে দেখা যায়, এটি একটি ধারাবাহিক ভাঙনের গল্প। জ্বালানি সংকট থেকে বিদ্যুৎ ঘাটতি, সেখান থেকে জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা, আর শেষ পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত—সব মিলিয়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক আজ এক অনিশ্চিত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ডাটা সেন্টার, যা পুরো নেটওয়ার্কের “মস্তিষ্ক”, সেটিই যদি জ্বালানির অভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়বে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিষয়টি নজরে রয়েছে এবং দ্রুত সমাধান হবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। লোডশেডিং বাড়ছে, জ্বালানি সংগ্রহে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষের কণ্ঠে বাড়ছে উৎকণ্ঠা। এই বৈপরীত্যই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ।

বিদেশে বসবাসকারী প্রবাসীদের জন্য বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেলে দেশের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। জরুরি সময়ে খোঁজ নেওয়া, অর্থ পাঠানো, এমনকি একটি সাধারণ বার্তা আদান-প্রদানও কঠিন হয়ে উঠবে। প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল এই সম্পর্কগুলো হঠাৎ করেই যেন অন্ধকারে ডুবে যেতে পারে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—এই সম্ভাব্য সংকটকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে? প্রযুক্তিকে অনেক সময় স্থায়ী ধরে নেওয়ার প্রবণতা থাকে। মনে করা হয়, নেটওয়ার্ক সবসময় সচল থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা দেখাচ্ছে, সেই ধারণা কতটা ভঙ্গুর।

এই পরিস্থিতি একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা—অর্থনৈতিক কাঠামোকে একমুখী নির্ভরশীলতা থেকে বের করতে হবে। বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা, অফলাইন লেনদেন এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।

কারণ সংকট হঠাৎ করে আসে না; সংকট তার আগমনের পূর্বাভাস দেয়। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সেই পূর্বাভাসই বহন করছে। একজন প্রবাসী হিসেবে দূর থেকে সেই গন্ধ স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে—সর্বনাশের গন্ধ।

এখন প্রশ্ন একটাই: সময় থাকতে কি যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়া হবে, নাকি সংকট যখন দরজায় কড়া নাড়বে, তখনই তার ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে হবে?

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ২২ এপ্রিল ২০২৬