মোখলেছুর রহমান
সেদিন পত্রিকায় দেখলাম ও পড়লাম, ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মোখলেছুর রহমান নামের এক তরুণ নিজের শরীরে স্লোগান লিখে দাঁড়িয়ে আছেন— এটি শুধু একটি প্রতিবাদের ছবি নয়, বরং একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি। যখন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত মানুষের দেহে, মনের ভেতরে এবং রান্নাঘরের হাঁড়িতে এসে আঘাত করে, তখন প্রতিবাদ আর কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে না— তা হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত, দৃশ্যমান এবং বেদনাময়। কে জানে, আগামীতে নূর হোসেনের মতো মোখলেছুরদের আত্মাহুতি দিতে হয় কি না!
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি অর্থনীতির এমন একটি কেন্দ্রবিন্দু, যার সঙ্গে প্রতিটি খাতের নাভিশ্বাস জড়িয়ে থাকে। ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন— সবকিছুর দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে “ব্যয়ের আগুন” ছড়িয়ে পড়েছে, তা আসলে একটি চেইন রিঅ্যাকশন। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, উৎপাদন খরচ বাড়ে, তারপর বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়ে— শেষ পর্যন্ত এই আগুন গিয়ে জ্বলে ওঠে সাধারণ মানুষের সংসারে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো— আয় স্থির, ব্যয় অস্থির। অর্থনীতির ভাষায় এটিই প্রকৃত সংকট। কারণ আয় না বাড়লেও যখন প্রতিটি খাতে ব্যয় বাড়ে, তখন মানুষের জীবনযাত্রার মান অদৃশ্যভাবে নেমে যায়। একজন মধ্যবিত্ত মানুষ হয়তো এখনও একই বেতন পাচ্ছেন, কিন্তু সেই বেতনের ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে।
গণপরিবহন এই সংকটের প্রথম বাহক। ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা হোক বা না হোক, বাস্তবে যাত্রীদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ছাড়াই বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠছে। ফলে শহরের কর্মজীবী মানুষ, যারা প্রতিদিন বাস-ভিত্তিক জীবনযাপন করেন, তারাই প্রথম ধাক্কা খাচ্ছেন।

তারপর আসে বাজার। সবজি, মাছ, মাংস— সবকিছুর দাম যেন একযোগে ঊর্ধ্বমুখী। পরিবহন ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই চাপ আরও তীব্র হয়েছে। রাজধানীর অনেক বাজারে সবজির দাম ইতিমধ্যেই ১০০ টাকার ওপরে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোজ্যতেলের সংকট। বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় খোলা তেলের দামও বেড়ে গেছে। রান্নাঘর এখন আর শুধু খাবারের জায়গা নয়, এটি হয়ে উঠেছে হিসাব-নিকাশের কেন্দ্র।
একজন ক্রেতার ভাষায়, আগে যেখানে ৫০০ টাকায় একদিনের বাজার করা যেত, এখন সেখানে ৭০০–৮০০ টাকা ছাড়া সম্ভব নয়। এই পরিবর্তন পরিসংখ্যানে ছোট মনে হলেও বাস্তবে এটি পরিবারের বাজেটকে ভেঙে দিচ্ছে।
এই সংকট শুধু খরচ বাড়ার গল্প নয়; এটি আয়ের সংকোচনেরও গল্প। উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন কমাচ্ছে, শ্রমিকদের ওভারটাইম কমছে, কোথাও কোথাও চাকরির অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। পরিবহন খাতে একই চিত্র— গাড়ি কম চলছে, আয় কমছে চালক-সহকারীদের।
অর্থনীতির এই পর্যায়ে এসে সবচেয়ে ভয়াবহ শব্দটি হলো— মূল্যস্ফীতি। এটি এমন এক অদৃশ্য চাপ, যা সবার ওপর পড়ে কিন্তু কেউ সরাসরি দেখতে পায় না। হাতে টাকা থাকলেও সেই টাকায় আগের মতো পণ্য কেনা যায় না— এটাই বাস্তবতা। দীর্ঘমেয়াদে এটি দারিদ্র্য বাড়ায় এবং সামাজিক বৈষম্য গভীর করে।
কৃষি খাতও এই চাপ থেকে মুক্ত নয়। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচ বেড়ে যাবে, ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে চাল, ডালসহ মৌলিক খাদ্যপণ্যের দামে। অর্থাৎ সামনে আরও একটি মূল্যস্ফীতির ঢেউ অপেক্ষা করছে।
সরকারের যুক্তি একেবারে অমূলক নয়। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, ভর্তুকির চাপ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাস্তবতা— সব মিলিয়ে এই সিদ্ধান্ত অনেকটা অনিবার্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে— অর্থনৈতিক বাস্তবতা মেনে নেওয়ার দায় কি শুধু সাধারণ মানুষের?

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়া মানেই মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ। প্রথমে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, তারপর উৎপাদন খরচ, এবং শেষে সব পণ্যের দাম। এই চক্র শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দেয়। তাই বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিক স্থিতিশীলতারও প্রশ্ন।
বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেকেই “মরার ওপর খাঁড়ার ঘা” হিসেবে দেখছেন। কারণ আগে থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আয়ের স্থবিরতার মধ্যে থাকা মানুষ এখন নতুন করে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাচ্ছেন। রাজনৈতিক বক্তব্যে এটি হয়তো সমালোচনার ভাষা, কিন্তু জনজীবনে এর প্রতিফলন অত্যন্ত বাস্তব।
এখন প্রশ্ন একটাই— করণীয় কী?
সমাধান জটিল হলেও অসম্ভব নয়। বাজারে কঠোর নজরদারি, গণপরিবহনে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, কৃষি ও উৎপাদনে প্রণোদনা— এগুলো এখন আর বিকল্প নয়, বরং প্রয়োজনীয়তা। পাশাপাশি সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।
সেইসাথে যারা তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে তাদেরকে সরকারের উচিত খুজে বের করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা। কারণ দেশে আসলে তেলের তেমন সংকট নেই। প্রচুর তেল আসছে বিভিন্ন দেশ থেকে। পাশের দেশ ভারত থেকেও আসছে। কিন্তু চোরাকারবারীরা সেটা আবার অবৈধ পথে ভারতে পাচার করছে। এভাবেই চুয়াত্তর সালে খাদ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দেশে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেছিল এক শ্রেণীর চোরাকারবারীরা।
সবশেষে ফিরে আসি সেই তরুণ মোখলেছুরের কাছে। তার শরীরে লেখা স্লোগান আসলে একটি দেশের অর্থনৈতিক ব্যথার ভাষা। যখন মানুষ নিজের শরীরকে প্রতিবাদের ক্যানভাস বানায়, তখন বুঝতে হয়— এটি আর কেবল নীতির বিষয় নয়, এটি জীবনের সংকট। আমরা চাই না, নব্বই এর মতো আরেকটা নূর হোসেনের মতো মোখছুরের জীবন নষ্ট হোক।
তবে মোখলেছুরের এই আগুন শুধু জ্বালানির নয়— এটি জীবনের। আর সেই আগুন যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তবে পুড়ে যাবে কেবল অর্থনীতি নয়, মানুষের আস্থাও।