ব্রেক্সিটের পরে উঠে আসছে জার্মানি-ইতালি: সিটি অব লন্ডনের নতুন গবেষণা
ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় বাজারে নেতৃত্ব হারিয়েছে লন্ডন
লন্ডন, ১৬ এপ্রিল: ব্রেক্সিটের মূল উদ্দেশ্যই ছিল যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ককে নতুনভাবে গড়ে তোলা। কিন্তু এর একটি কম দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেছে আর্থিক বাজারে, যা পেনশন ফান্ড থেকে শুরু করে ঋণ নেওয়ার খরচ পর্যন্ত প্রভাবিত করছে।
গণভোটের আগে পরিস্থিতি এমন ছিল যে, লন্ডনের শেয়ারবাজারে সামান্য ধাক্কা লাগলেই ইউরোপজুড়ে তার প্রভাব পড়ত। কিন্তু এখন আমাদের গবেষণা বলছে, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সম্পর্ক উল্টে গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে লন্ডন ছিল ইউরোপীয় অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু এবং একে বলা হতো “নেট ট্রান্সমিটার”—অর্থাৎ আর্থিক ঝাঁকুনি বা অস্থিরতা অন্য দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার উৎস। লন্ডনের শেয়ারবাজারে পরিবর্তন হলে তা সঙ্গে সঙ্গে প্যারিস, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও মিলানের বিনিয়োগকারীদের ওপর প্রভাব ফেলত। ইউরোপীয় একক বাজারের সঙ্গে লন্ডনের প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগই এই নেতৃত্বের ভিত্তি ছিল।
ব্রেক্সিটের পর এই প্রভাব বজায় আছে কি না, তা যাচাই করতে আমরা ইউরোপের নয়টি দেশের শেয়ারবাজারের দৈনিক ওঠানামা বিশ্লেষণ করেছি। তুলনা করা হয়েছে দুটি পাঁচ বছরের সময়কাল—ব্রেক্সিট ভোটের আগে (২০১১–২০১৬) এবং যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পর (২০২০–২০২৫)।
এখানে আমরা ব্যবহার করেছি একটি বিশেষ আর্থিক সূচক—“নেট ভোলাটিলিটি স্পিলওভার স্কোর”—যা একটি বাজার কতটা ঝুঁকি (অস্থিরতা) অন্য বাজারে পাঠায় এবং কতটা গ্রহণ করে, তার পার্থক্য নির্ধারণ করে।
ফলাফল ছিল স্পষ্ট। ব্রেক্সিটের আগে যুক্তরাজ্যের স্কোর ছিল +১১.৮, অর্থাৎ তারা যতটা ঝাঁকুনি গ্রহণ করত তার চেয়ে অনেক বেশি ইউরোপে পাঠাত। কিন্তু ব্রেক্সিটের পর এই স্কোর নেমে এসেছে –৫.৫-এ। এখন যুক্তরাজ্য বরং ইউরোপ থেকে বেশি ঝাঁকুনি গ্রহণ করছে—অর্থাৎ এটি “নেট রিসিপিয়েন্ট” হয়ে গেছে।
এর প্রধান কারণ হলো, ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীরা এখন আর যুক্তরাজ্যের বাজার সংকেতের প্রতি আগের মতো সাড়া দেন না। যুক্তরাজ্যে আর্থিক অস্থিরতা এখনও ঘটে, কিন্তু তা এখন ইউরোপের বাকি অংশের কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে, একই সময়ে জার্মানির প্রভাব প্রায় ৫০% বেড়েছে, আর ইতালি একসময় যে “শক শোষক” ছিল, এখন সেটি হয়ে উঠেছে দ্বিতীয় সবচেয়ে প্রভাবশালী বাজার।
যখন লন্ডন ছিল ইউরোপের আর্থিক নেতা, তখন তার বাজার সংকেতই নির্ধারণ করত মহাদেশজুড়ে বিনিয়োগকারীরা কীভাবে ঝুঁকি মূল্যায়ন করবেন। এর ফলে পুঁজি প্রবাহ, ঋণের খরচ এবং বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে সিটির অতিরিক্ত প্রভাব ছিল।
এখন সেই প্রভাব কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু সিটির ট্রেডারদের অফিসে সীমাবদ্ধ নেই।
যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে পুঁজি তুলতে চায়, তাহলে তাদের বেশি খরচ পড়তে পারে। কারণ ইউরোপীয় বাজার এখন ব্রিটিশ মূল্য সংকেতের সঙ্গে আগের মতো সংযুক্ত নয়। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপীয় শেয়ারে বিনিয়োগ করা একটি ব্রিটিশ পেনশন ফান্ড এখন লন্ডনের পরিবর্তে ফ্রাঙ্কফুর্ট বা মিলানের ঘটনাবলীর ওপর বেশি নির্ভরশীল।
এছাড়া সীমান্ত-পার বাণিজ্য ও বিনিয়োগের আর্থিক পরিবেশেও যুক্তরাজ্যের প্রভাব কমেছে—যা শেষ পর্যন্ত চাকরি, মর্টগেজ এবং জীবনযাত্রার খরচে প্রভাব ফেলে।
স্থানবদলের বাস্তবতা
অবকাঠামোগত দিক থেকেও একই চিত্র দেখা যায়। ব্রেক্সিটের পর ৪৪০টির বেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের কিছু কার্যক্রম যুক্তরাজ্য থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে সরিয়ে নিয়েছে। এর ফলে প্রায় ৯০০ বিলিয়ন পাউন্ডের ব্যাংক সম্পদ—যেমন ব্যবসায়িক ঋণ, বিনিয়োগ পোর্টফোলিও ও নগদ রিজার্ভ—ইউরোপে স্থানান্তরিত হয়েছে, যা যুক্তরাজ্যের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রায় ১০%।
এই পরিবর্তনে লন্ডনের জায়গা একক কোনো শহর নেয়নি। বরং ফ্রাঙ্কফুর্ট, প্যারিস ও ডাবলিনসহ একাধিক ইউরোপীয় কেন্দ্র এই কার্যক্রম ভাগ করে নিয়েছে। ফলে লন্ডন এখনও একটি বড় আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র হলেও, ইউরোপের সঙ্গে তার সরাসরি সংযোগ দুর্বল হয়েছে।
তাহলে কি লন্ডন আবার তার প্রভাব ফিরে পেতে পারে? সম্ভাবনা কম। এটি বাজারের সাময়িক অস্থিরতার ফল নয়, বরং কাঠামোগত পরিবর্তন। ইউরোপীয় আর্থিক নেটওয়ার্ক সংকুচিত হয়নি, বরং পুনর্গঠিত হয়েছে। জার্মানি ও ইতালির মতো দেশগুলো যুক্তরাজ্যের ছেড়ে দেওয়া জায়গা দখল করেছে।
আইনি পরিবর্তন, কার্যক্রম স্থানান্তর এবং আর্থিক সেবায় নীতিগত ভিন্নতার কারণে গড়ে ওঠা এই নতুন ব্যবস্থা সহজে বদলাবে না।
যদিও সাম্প্রতিক যুক্তরাজ্য-ইইউ বৈঠকে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তবুও তা এখনো মূলত পণ্য বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে সীমাবদ্ধ। আর্থিক খাতে পরিবর্তন না এলে, ইউরোপীয় বাজারে লন্ডনের কমে যাওয়া প্রভাব আপাতত স্থায়ীই মনে হচ্ছে।
এর অর্থ এই নয় যে লন্ডন একটি আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ইউরোপীয় নেটওয়ার্কে তার ভূমিকা মৌলিকভাবে বদলে গেছে।
একসময় যে লন্ডন ছন্দ নির্ধারণ করত, এখন সে অন্যের ছন্দে তাল মেলাচ্ছে। আর একটি দেশ, যার অর্থনৈতিক শক্তির বড় অংশই গড়ে উঠেছিল আর্থিক সেবার ওপর, তার জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক বড় পরিবর্তন।