দ্বিতীয় পদ্মা-যমুনা সেতুসহ ২০ মেগা প্রকল্পে চীনা অর্থায়ন চায় বাংলাদেশ

দ্বিতীয় পদ্মা-যমুনা সেতুসহ ২০ মেগা প্রকল্পে চীনা অর্থায়ন চায় বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৬ জুন:

দেশের যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে নতুন যুগের সূচনা করতে চীনের অর্থায়নে একাধিক বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, দ্বিতীয় যমুনা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম উড়াল মহাসড়ক, রাজধানীতে সাবওয়ে নির্মাণ এবং নতুন রেললাইন স্থাপনসহ প্রায় ২০টি বড় প্রকল্পের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরে এসব প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সফরের আগে সড়ক, সেতু ও রেল খাতের বিভিন্ন সংস্থা তাদের অগ্রাধিকার প্রকল্পের তালিকা চূড়ান্ত করছে।

দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতুতে বিশেষ গুরুত্ব

সরকারের পরিকল্পনায় সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ। বর্তমানে বিদ্যমান যমুনা সেতুর ওপর যানবাহনের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের সময়ে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হওয়ায় বিকল্প সেতুর প্রয়োজনীয়তা অনেকদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।

সম্ভাব্য নতুন যমুনা সেতুর জন্য একাধিক রুট নিয়ে সমীক্ষা চলছে। এর মধ্যে গাইবান্ধার বালাসীঘাট ও জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের মধ্যবর্তী পথ বিশেষভাবে বিবেচনায় রয়েছে।

অন্যদিকে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ও রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ার মধ্যে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাও গুরুত্ব পেয়েছে। পদ্মা নদী পারাপারে ভবিষ্যতের চাহিদা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বিবেচনায় নিয়ে এই প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রামে উড়াল মহাসড়কের ভাবনা

রাজধানী ও দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে আরও দ্রুত সংযুক্ত করতে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে একটি উড়াল মহাসড়ক নির্মাণের পরিকল্পনাও তালিকায় রয়েছে।

বর্তমানে এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী যান চলাচল করে। ক্রমবর্ধমান যানচাপ সামাল দিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি এক্সপ্রেসওয়ে বা এলিভেটেড করিডরের আলোচনা চলছিল। নতুন উদ্যোগে সেটি আবারও সামনে এসেছে।

ঢাকায় সাবওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা

রাজধানীর ভয়াবহ যানজট কমাতে ঢাকায় পাতাল রেলপথ বা সাবওয়ে নির্মাণের বিষয়টিও চীনা অর্থায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।

সমীক্ষা অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ করিডরে প্রায় ২৩৮ কিলোমিটার সাবওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে কয়েকটি রুট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যার সম্ভাব্য ব্যয় কয়েক দশ হাজার কোটি টাকা।

পরিকল্পনাবিদদের মতে, মেট্রোরেলের পাশাপাশি সাবওয়ে চালু হলে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

নতুন এক্সপ্রেসওয়ে ও সেতু নির্মাণ

সরকারের বিবেচনায় থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে হেমায়েতপুর-কেরানীগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, দ্বিতীয় মুক্তারপুর সেতু, পাবনা-রাজবাড়ী সংযোগ সেতু এবং পটুয়াখালী অঞ্চলে নতুন চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু নির্মাণ।

এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

রেল খাতেও বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা

চীনা অর্থায়নের সম্ভাব্য তালিকায় রেলওয়ের বেশ কয়েকটি প্রকল্পও রয়েছে। এর মধ্যে আখাউড়া-সিলেট রেলপথ আধুনিকীকরণ, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর ডাবল লাইন নির্মাণ, নতুন মিটারগেজ ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহ এবং রাজবাড়ীতে আধুনিক রেল ওয়ার্কশপ স্থাপনের পরিকল্পনা উল্লেখযোগ্য।

রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে রেলের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু বড় প্রকল্প নিলেই হবে না; প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। অতীতে অনেক ব্যয়বহুল প্রকল্প প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারেনি কারণ সহায়ক অবকাঠামো ও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব ছিল।

পরিবহন বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সেতু বা মহাসড়ক নির্মাণের পাশাপাশি সংযোগ সড়ক, নগর পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে বিনিয়োগের পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাবে না।

চীনের সহায়তায় নতুন এই অবকাঠামো কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন, বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।