কলিকালের কলধ্বনি ।। ৭৬ ।। সিলোটি পুয়া, না সিলোটি দামান—কে হচ্ছেন দেশের আগামীর প্রধান?

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৭৬ ।। সিলোটি পুয়া, না সিলোটি দামান—কে হচ্ছেন দেশের আগামীর প্রধান?

 উৎসর্গ

 সিলেটিদের- যাঁরা দেশের রাজনীতি ও সমাজে নিজেদের পরিচয় নিয়ে ভাবেন

 

(পাঠকদের প্রতিদিনের কঠিন ও গুরুগম্ভীর কলাম পাঠের চাপ থেকে সামান্য আরাম দিতেই আজকের এই ব্যতিক্রমধর্মী কলাম। ইচ্ছাকৃতভাবেই সিলেট অঞ্চলের কিছু আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এই লেখায়—লেখক)

                        বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান                                                      আমীরে জামাত শফিকুর রহমান

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এবার এক অদ্ভুত কিন্তু রসালো সমীকরণ তৈরি হয়েছে। যেদিকেই তাকান, আলোচনার কেন্দ্রে ঘুরেফিরে আসছে একটি নাম, একটি ভূগোল—সিলেট। প্রশ্নটা এখন খুবই সরল, কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক— ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ নির্বাচনে কে হচ্ছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী-  সিলোটি পুয়া, না কি সিলোটি দামান?

দু’জনের নামেও আছে মিল। একজন তারেক রহমান, অপরজন শফিকুর রহমান। দেশের দুই ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার দুই শীর্ষ নেতা—বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান—দু’জনের জীবন ও রাজনীতির সঙ্গে সিলেটের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ যে, জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় সিলেট আজ নতুন এক ভূগোল হয়ে উঠেছে।

একদিকে তারেক রহমান। জন্ম ঢাকায় হলেও তাঁর জীবনসঙ্গীর শেকড় সিলেটের মাটিতে। শ্বশুরবাড়ি সিলেট শহরতলির সিলাম এলাকায়। তার ওপর দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় লন্ডনে সিলেটি প্রবাসীদের সঙ্গে বসবাস, ওঠাবসা, সহবত। লন্ডনে তিনি বলা যায়, সিলেটিদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে ছিলেন পুরো প্রবাসজীবন। নিজেই একসময় রসিকতা করে বলেছেন—সিলেটি কইন্যা বিয়ে করে এবং সিলেটি প্রবাসীদের সঙ্গে থাকতে থাকতে তিনি নিজেই নাকি অর্ধেক সিলেটি হয়ে গেছেন।

এই কথার ভেতর দিয়ে শুধু পারিবারিক সম্পর্ক নয়, সিলেটি সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিতও মেলে। সিলেটের কমলা, জলডুপ আনারস, সাতকরা, সাতরঙা চা কিংবা রসের পান-সুপারি—এসব স্বাদ তাঁর জীবনে নতুন নয় বলেই অনুমান করা যায়। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে সিলেটি সমাজের জীবনযাপন তাঁকে আলাদা এক অভিজ্ঞতা দিয়েছে। আবার নির্বাচনের সূচনা করেছেন সিলেটের হযরত শাহ্জালাল (র:) এবং হযরত শাহ্পরান (র:) এর মাজার জেয়ারতের মধ্য দিয়ে।

অন্যদিকে ডা. শফিকুর রহমান জন্মসূত্রেই সিলেটের ‘পুয়া’। চায়ের রাজধানী মৌলভীবাজারের কুলাউড়া তাঁর শেকড়, বসবাস সিলেট শহরে ও ঢাকায়। চা-বাগানের সবুজ ঢেউ, পাহাড়ি বাতাস, নদীর স্রোত—এই ভূগোল তাঁর চিন্তা, চরিত্র ও রাজনৈতিক সত্তাকে গড়ে তুলেছে। সিলেটের মাটি, মানুষ, ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক জন্মগত, স্বাভাবিক এবং গভীর।

দু’জনের রাজনৈতিক যাত্রাপথ আলাদা হলেও কিছু মিল বিস্ময় জাগায়। দু’জনই দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকেও নিজ নিজ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে অটল। মাঠের রাজনীতির চেয়ে সংগঠন, কৌশল ও বক্তব্যে তারা বেশি সক্রিয়। তাঁদের নাম উচ্চারিত হলেই জাতীয় রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়ে, আর সিলেটে বাড়ে কৌতূহল।

দু’জনই তরুণ বয়স থেকে রাজনীতির পাঠশালায় হাতেখড়ি নিয়েছেন। বগুড়া জেলার বিএনপির সদস্য হিসাবে যোগদান করে ধীরে ধীরে দলের চেয়ারম্যান হয়েছেন। তারপর ক্রমে ক্রমে তারেক রহমান আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও নির্বাচনী রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তাঁর রাজনীতির ভাষা তুলনামূলকভাবে উদার, ক্ষমতাকেন্দ্রিক এবং রাষ্ট্র পরিচালনামুখী। অন্যদিকে ডা. শফিকুর রহমানের রাজনীতি আদর্শভিত্তিক, নৈতিকতার ওপর জোর দেওয়া এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে সামনে রেখে সংগঠিত। তিনিও আমাদের চোখের সামনে সিলেট জামাতের তৃণমূল রাজনীতি করে করে দলের আমীর বা প্রধান হয়ে উঠেছেন।

এদিকে, তারেক রহমানের শক্তি দলীয় ঐতিহ্য ও বৃহৎ ভোটব্যাংক। ডা. শফিকুর রহমানের শক্তি শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মীসমর্থক ও নৈতিক অবস্থানের প্রচার। একজন রাজনীতিতে “পলিটিক্যাল ম্যানেজার”, আরেকজন “আইডিওলজিক্যাল লিডার”—এই পার্থক্যই দু’জনকে আলাদা করে।

তবে এখানে অমিল হচ্ছে—তারেক রহমানের রাজনীতিতে একটা পারিবারিক লিগেসি আছে। আর শফিকুর রহমানের এ ধরনের কোনো রাজনৈতিক পারিবারিক লিগেসি নেই। দু‘জনই বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে প্রচুর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন।

বয়সে দু’জনই ষাট পেরিয়েছেন। দু‘জনই দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। দুই নেতাই ধার্মিক। দু‘জনেই আগে মহান আল্লাহর উপর ভরসা রেখে আলোচনা শুরু করেন। আবার মজার আরেকটা মিল হচ্ছে, নির্বাচনের ক্যাম্পাইনে দু‘জনেই দুটি বড় বড় বুলেটপ্রুফ বাসে করে জনসংযোগ করেছেন। তবে তারেক রহমানের বাস লাল রঙের আর শফিকুর রহমানের বাসের রং সবুজ। এ যেন লাল সবুজের পালা। দু‘জনের বাসের রং মিলে দেশের পতাকার দুটি রং।

আরও একটি কাকতালীয় মিল রয়েছে—দু’জনের স্ত্রী-ই দেশের খুব নামকরা ডাক্তার। দু’জনই ছাত্রী জামানায় খুব ভাল রেজাল্ট করে পাশ করেছেন। একজন ডা. জুবায়দা রহমান, অপরজন ডা. আমেনা রহমান। দু’জনেরই রয়েছেন সুশিক্ষিত সন্তান। শফিক সাহেবের দুই মেয়ে ও একমাত্র ছেলে স্বনামখ্যাত ডাক্তার। আর এদিকে তারেক সাহেবের একমাত্র মেয়ে জাইমা রহমান একজন স্বনামখ্যাত ব্যারিস্টার।

ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, দীর্ঘ দেড় যুগ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী জোটবদ্ধ ছিল। তখন তারা নিজেদের “একই মায়ের দুই সহোদর” অথবা ‘এই বৃন্তে দু’টি ফুল’ বলেই পরিচয় দিতেন শেখ হাসিনার শাসনামলে। ক্ষমতায় থাকা, বিরোধী দলে থাকা—সব লড়াইয়ে ছিল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পথচলা। আজ দুই দলের শীর্ষ দুই নেতা আলাদা পথে হাঁটলেও, ক্ষমতার সমীকরণে আবারও তারা আলোচনার কেন্দ্রে।

এই প্রেক্ষাপটে সিলেটের মানুষের চাওয়া খুব বেশি নয়। ব্রিটিশ আমল থেকে হাসিনা সরকারের আমল পর্যন্ত—সব সময়ই সিলেট বিভাগ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক মন্ত্রী পদে আসীন হয়েছেন। এবারই প্রথম সিলেট থেকে একজন সরকারপ্রধান এবং অন্যজন বিরোধী দলের প্রধান হতে যাচ্ছেন। 

তরুণ বয়সে দু’জনের সাথেই কিঞ্চিত পরিচয় হয়েছিল। এটা ওদের কারো মনে রাখার কোন কারণ নেই। তবে আবার হঠাৎ তাঁদের সাথে দেখা হলে, যেন সিলোটি কায়দায় অন্তত ‘পান-গুয়া’ দিয়ে আপ্যায়ন করেন—এই আশা করবো। বস্তুত সব প্রবাসী সব সিলেটিই তাঁদের কাছে আন্তরিকতাটুকুই আশা করেন।  একটু কাব্য করে বলি—

সিলটর দামান কিংবা সিলটর পুয়া
তাঁরার কাছে চাই শুধু পান আর গুয়া (সুপারি)।

কারণ, সিলেট অঞ্চলে ‘পান-গুয়া’ কোনো খাদ্যাভ্যাসের দাবি নয়। এটি সিলেটি আতিথেয়তার প্রতীক। যে অতিথিকে ‘পান-সুপারি’ দেওয়া হয়, তাকে সম্মান দেওয়া হয়, আপনজন ধরা হয়। তাই একজন সিলেটি হিসাবে রূপকভাবে বলছি—আমরা বড় কিছু চাই না, শুধু আমাদের যেন আপনজনের মতো দেখা হয়। কারণ, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত লেখালেখি করে আর রেমিটেন্স পাঠিয়ে আমরা তো আদতে তাঁদেরকেই সহায়তা করে চলেছি, দেশ থেকে কোন কিছু না নিয়ে।

সিলেটের দামান হোন বা সিলেটের পুয়া—দু’জনের জীবনেই সিলেটের স্বাদ, গন্ধ, ভাষা, মানুষ ও সংস্কৃতি মিশে আছে। সিলেটিরা তাই খুব বেশি কিছু আশা করে না—শুধু চায় সম্মান, মর্যাদা, আর সিলেটি আতিথেয়তার উষ্ণতা যেন দেশের নেতৃত্বেও প্রতিফলিত হয়। পান আর গুয়া—এই দুই রূপকই সিলেটের মানুষের সরল, আন্তরিক ও মানবিক প্রত্যাশার প্রতীক।

সিলেটি মানুষগণ জানেন—রাজনীতি জটিল, ক্ষমতার পথ আরও জটিল। তাই সিলেটিদের দাবি-দাওয়া খুবই সরল, প্রায় ঘরোয়া। তারা চান দুই রহমান সাহেবের যেকোনো একজন প্রধানমন্ত্রী আর অপরজন বিরোধী দলের প্রধান হলে—দেশে ও প্রবাসে সিলেটিরা যেন তাঁদের প্রাপ্য সম্মানটুকু পায় দেশে গেলে। একজন প্রবাসী হিসাবে আশা থাকবে, রেমিটেন্স যোদ্ধারা—যাঁরা দেশের অর্থনীতিকে টেনে রাখেন, কিন্তু বিমানবন্দরে অনেক সময় অযথা হয়রানির শিকার হন, দেশের জায়গা-জমি নিয়ে ঝামেলায় পড়েন—তাঁদের সমস্যাগুলো যেন সমাধান করে দেওয়া হয়। পরিশেষে বলি, দু’জনেরই যে-ই ভোটে জয়ী হবেন তাতেই আমাদের লাভ, নেই কোন ক্ষতি। আজকে কলামের এখানেই করলাম ইতি। 

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬