কলিকালের কলধ্বনি ।। ১১৯ ।। মেয়র প্রার্থী লুৎফুর রহমান: স্বমহিমায় সবার জন্য বহমান

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১১৯ ।। মেয়র প্রার্থী লুৎফুর রহমান: স্বমহিমায় সবার জন্য বহমান

উৎসর্গ

টাওয়ার হ্যামলেটসের ভোটারদের,
যাঁরা প্রতিটি নির্বাচনে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করেন

পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস—এটি কেবল একটি নগর প্রশাসনের নাম নয়; এটি বহু মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সমষ্টি। এই জনপদে রাজনীতি মানে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়, বরং মানুষের জীবনের মান নির্ধারণের একটি বাস্তব প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে বারবার উঠে এসেছে একটি নাম—লুৎফুর রহমান।

তিনি কেবল একজন মেয়র প্রার্থী নন; বরং এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, বিতর্ক, প্রত্যাবর্তন এবং জনআস্থার বহমান ধারার প্রতীক। তার সমর্থকদের কাছে তিনি এমন এক নেতা, যিনি কাগজে নয়, মানুষের জীবনে কাজের ছাপ রাখতে চেয়েছেন।

গত সময়গুলোতে তাঁর নেতৃত্বে যে উদ্যোগগুলো সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা, সবার জন্য সাঁতারের সুবিধা উন্মুক্ত করা, বয়স্ক ও অসহায়দের জন্য গৃহসেবা সম্প্রসারণ, এবং সংকটে থাকা পরিবারগুলোর জন্য সরাসরি সহায়তা ব্যবস্থা জোরদার করা। এসব উদ্যোগ কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না; এগুলো বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তির ছোঁয়া এনে দিয়েছে।

আবাসন সংকট, যা টাওয়ার হ্যামলেটসের দীর্ঘদিনের একটি বাস্তব সমস্যা, তা মোকাবিলায়ও তার পরিকল্পনা ও উদ্যোগ সমর্থকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ভাড়া সহায়তা এবং আবাসন সহায়তা কার্যক্রম অনেক পরিবারকে টিকে থাকার সুযোগ দিয়েছে। পাশাপাশি, নতুন করে প্রায় ১২ হাজার সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণের অঙ্গীকার একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা—এই শহরকে সবার জন্য বাসযোগ্য রাখার প্রচেষ্টা।

তরুণ প্রজন্মকে ঘিরেও তার পরিকল্পনায় স্পষ্ট দৃষ্টি দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য যাতায়াত সুবিধা সহজ করা, নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তার উদ্যোগ, এবং দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানমুখী কর্মসূচি—এসবই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়াস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অর্থনৈতিক চাপ কমানোর ক্ষেত্রেও কিছু সরাসরি উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে—গর্ভকালীন সহায়তা, ভাড়া সংকটে থাকা মানুষের জন্য সহায়তা তহবিল বৃদ্ধি, এবং স্থানীয় করের চাপ স্থিতিশীল রাখার পরিকল্পনা। রাজনীতি তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের পকেট ও দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হয়—এই ধারণাটিই এখানে প্রতিফলিত।

একই সঙ্গে কমিউনিটি উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সংগঠনগুলোকে সহায়তা, যুব কেন্দ্র ও নারী সহায়তা কেন্দ্র সম্প্রসারণ, এবং সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো—এসব উদ্যোগ টাওয়ার হ্যামলেটসকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এই সমর্থনের পাশাপাশি রাজনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে। অতীতের বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচন, সেবা সীমিত হওয়া এবং কমিউনিটি সহায়তার ঘাটতি নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছিল, তা এই নির্বাচনে তুলনার একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। ফলে ভোটারদের সামনে স্পষ্ট একটি পার্থক্য উপস্থিত—একদিকে সেবা সংকোচনের ধারণা, অন্যদিকে সামাজিক বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি।

এই প্রেক্ষাপটে টাওয়ার হ্যামলেটসের মানুষ একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি—তাঁরা এখন কেমন বারা চান? এমন একটি বারা, যেখানে সীমাবদ্ধতার যুক্তি সামনে এনে সেবা কমানো হয়, নাকি এমন একটি বারা, যেখানে সংকটের মাঝেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পথ খোঁজা হয়?

লুৎফুর রহমানকে ঘিরে সমর্থন ও সমালোচনা—দুইই এই বারার রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। কিন্তু তার কাজ, পরিকল্পনা এবং মানুষের সঙ্গে সংযোগ তাকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

শেষ পর্যন্ত, ভোট কেবল একটি পছন্দ নয়—এটি একটি সিদ্ধান্ত।
এই সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে, একটি বারা কতটা মানবিক হবে, কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, এবং কতটা নিজের মানুষের জন্য দাঁড়াতে পারবে।

টাওয়ার হ্যামলেটস আজ সেই সিদ্ধান্তের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। আর এই সিদ্ধান্তই বলে দেবে—এই বারার ভবিষ্যৎ কোন পথে প্রবাহিত হবে।

সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর : সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ৬ এপ্রিল, ২০২৬