ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১১৪ ।। বিশ্ব শ্রমিক দিবসে অঙ্গিকার: নিশ্চিত হোক শ্রমিক অধিকার
উৎসর্গ
মে দিবসের রক্তাক্ত ইতিহাসের সকল শ্রমিক শহীদদের স্মরণে
প্রতি বছর ১ মে এলে বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের কথা নতুন করে উচ্চারিত হয়। রাজপথে ব্যানার ওঠে, বক্তৃতায় অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়ের কথা শোনা যায়। এই দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়—এটি একটি ইতিহাস, একটি সংগ্রাম, একটি রক্তাক্ত স্মৃতি।
১৮৮৬ সালের শিকাগোর শ্রমিক আন্দোলন Haymarket Affair-এর মধ্য দিয়ে যে দাবি উচ্চারিত হয়েছিল—“আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম, আট ঘণ্টা ব্যক্তিগত জীবন”—তা আজও বিশ্ব শ্রম আন্দোলনের মূল ভিত্তি হয়ে আছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ঐতিহাসিক অর্জনের আলো কি সত্যিই আজকের শ্রমিকের জীবনে পৌঁছেছে? নাকি সংকট এখনও রয়ে গেছে?

আসলে শ্রমিকদের এই সংকট কোনো একক দেশের নয়—এটি একটি বৈশ্বিক চিত্র। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা থেকে শুরু করে উন্নত বিশ্বের অভিবাসী শ্রমিকদের জীবনেও একই ধরনের শোষণ, অনিশ্চয়তা ও বৈষম্য দেখা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণ শ্রমিকরা, যারা বিশাল আকাশচুম্বী ভবন ও অবকাঠামো গড়ে তুলছেন, তাদের অনেকেই দীর্ঘ সময় কঠোর পরিশ্রম করেও ন্যায্য অধিকার ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত।

আবার ইউরোপ ও আমেরিকার অভিবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ অস্থায়ী কাজ, কম মজুরি এবং আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান। উন্নত অর্থনীতির ভেতরেও “গিগ ইকোনমি”র নামে এক নতুন ধরনের শ্রম শোষণ তৈরি হয়েছে, যেখানে ডেলিভারি বা প্ল্যাটফর্মভিত্তিক শ্রমিকরা নির্দিষ্ট চাকরির নিরাপত্তা ছাড়াই প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন। ফলে দেখা যায়, প্রযুক্তি ও উন্নয়নের শিখরে পৌঁছালেও শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে পৃথিবী এখনো এক অসমতার বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে।
বিশ্ব শ্রম দিবস বা মে দিবস এখন অনেক দেশের জন্য আনুষ্ঠানিকতা, ছুটির দিন কিংবা স্মরণসভায় সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। অথচ এর জন্ম হয়েছিল শ্রমিকের রক্ত, ঘাম এবং আত্মত্যাগের ভেতর দিয়ে। ইতিহাসের এই বৈপরীত্যই আজকের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বাস্তবতা আরও তীব্র, আরও স্পষ্ট। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলার শ্রমবাজারে প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক দাঁড়িয়ে থাকেন কাজের আশায়। নির্মাণ শ্রমিক, রংমিস্ত্রি, জোগালি, পরিবহন শ্রমিক কিংবা কৃষিশ্রমিক—সবাই এক অনিশ্চিত জীবনের ভেতর দিয়ে দিন পার করেন।

মে দিবসের সকালে যখন অফিস-আদালত বন্ধ থাকে, তখনও অনেক শ্রমিকের জীবনে কোনো ছুটি থাকে না। কারণ কাজ না করলে খাবার নেই, আয় নেই, জীবন নেই। এই নির্মম বাস্তবতা মে দিবসের ঘোষিত চেতনার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশে শ্রমিকদের বড় একটি অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। তাদের কোনো স্থায়ী চুক্তি নেই, নেই ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তা। আজ কাজ আছে, কাল নেই—এই অনিশ্চয়তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে তাদের জীবন। ফলে মে দিবস তাদের কাছে কোনো উৎসব নয়, বরং আরেকটি সাধারণ দিনের মতোই সংগ্রামের দিন।

শ্রমিকদের জীবনযাত্রার আরেকটি বড় সংকট হলো মজুরি ও ব্যয়ের বৈষম্য। দ্রব্যমূল্য প্রতিনিয়ত বাড়লেও শ্রমের মূল্য সেই অনুপাতে বাড়ছে না। একজন শ্রমিক মাসে যা আয় করেন, অনেক ক্ষেত্রেই তা দিয়ে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ঋণ, ধার-দেনা ও অনিশ্চয়তা তাদের জীবনের স্থায়ী অংশ হয়ে গেছে।

নারী শ্রমিকদের পরিস্থিতি আরও জটিল। তারা একদিকে কম মজুরি, অন্যদিকে অনিরাপদ কর্মপরিবেশের শিকার। একই কাজ করেও অনেক ক্ষেত্রে তারা পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় কম পারিশ্রমিক পান—যা বৈষম্যের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
অন্যদিকে, প্রযুক্তির পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক কাঠামোর রূপান্তর শ্রমবাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অটোমেশন, দক্ষতার অভাব এবং শিল্প খাতের অনিশ্চয়তা অনেক শ্রমিককে কাজ হারানোর ঝুঁকিতে ফেলছে। ফলে শ্রমিকের অধিকার এখন শুধু মজুরি নয়, বরং দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার প্রশ্নও হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শ্রম আইন থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল। অনেক শিল্পাঞ্চলে কর্মঘণ্টা নির্ধারিত নিয়ম মানা হয় না, নিরাপত্তা ব্যবস্থা উপেক্ষিত থাকে, দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় না। ফলে আইন ও বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে মে দিবস আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে যায়—যাদের শ্রমে সভ্যতা গড়ে ওঠে, তারা কি সত্যিই সেই সভ্যতার সমান অংশীদার?
শ্রমিকদের অবদান ছাড়া কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাস্তা, ভবন, শিল্পকারখানা, সেবা খাত—সবকিছুর পেছনে রয়েছে তাদের ঘাম। কিন্তু সেই ঘামের ন্যায্য মূল্য কতটা তারা পাচ্ছেন, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সমাধান একদিনে সম্ভব নয়, তবে দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, শ্রম আইন কার্যকর করা, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণ—এই চারটি বিষয় শ্রমিকদের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে।
মে দিবস তাই কেবল স্মরণ নয়, এটি প্রতিজ্ঞার দিন হওয়া উচিত। ইতিহাসের রক্তাক্ত অধ্যায় থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানকে বদলানোর অঙ্গীকারের দিন। কারণ শ্রমিকের মর্যাদা নিশ্চিত না হলে কোনো উন্নয়নই পূর্ণতা পায় না।
শেষ পর্যন্ত, মে দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা একটাই—সভ্যতা গড়ে ওঠে শ্রমিকের ঘামে, কিন্তু সেই সভ্যতার ন্যায্যতা নির্ভর করে তাদের অধিকার কতটা নিশ্চিত হলো তার ওপর।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ১ মে ২০২৬