ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প।। ৯ ।। একই সমতলে
একই সমতলে
।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।
উৎসর্গ
সকল মেসি ও রোনালদো ভক্তদের উদ্দেশ্যে

রাত গভীর হচ্ছে। গ্রামের চায়ের দোকানে এখনো আলো জ্বলছে। দোকানের নাম “নিউ স্টার স্পোর্টিং টি স্টল”। নাম শুনে মনে হয় যেন এখানে বসেই বিশ্বকাপ পরিচালনা করা হয়।
দোকানের এক কোণে বসে আছে রাকিব। সে মেসির ভক্ত। অন্য কোণে বসে আছে সোহেল। তার রক্তে রোনালদো। দুজনের চোখে ঘুম নেই। বিশ্বকাপ চলছে, ঘুমানোর সময় কোথায়!
টেলিভিশনের পর্দায় খবর ভেসে ওঠে। মেসি আর রোনালদোর নতুন এক রেকর্ড।
রাকিব চা হাতে নিয়ে বলে,
—দেখছিস? শেষ পর্যন্ত ইতিহাসও মেসির পক্ষে কথা বলে।
সোহেল হাসে।
—ইতিহাস না, ইতিহাসের বাবা কথা বলে রোনালদোর পক্ষে।
দোকানদার কাশেম মিয়া বিরক্ত মুখে তাকায়।
—তোরা দুইজন যদি একদিন বিয়ে করিস, তখনও ঝগড়া করবি কে বর আর কে কনে!
দোকানে হাসির রোল ওঠে।
কিন্তু আজকের খবরটা অন্যরকম।
মেসি আর রোনালদো। দুই মেরুর দুই মানুষ। দুই রঙের দুই স্বপ্ন। একজন আকাশি-সাদা, অন্যজন লাল-সবুজ।
এক সময় তাদের নাম শুনলেই পৃথিবী দুই ভাগ হয়ে যায়। বন্ধু বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে না। ভাই ভাইকে খোঁচা দেয়। ফেসবুকে যুদ্ধ লাগে।
কিন্তু আজ হঠাৎ দেখা যায়, তারা যেন একই রাস্তার দুই পথিক।
বিশ্বকাপে প্রথম গোল থেকে সর্বশেষ গোল—দুজনের মাঝের ব্যবধান ঠিক বিশ বছর এগারো দিন।
অদ্ভুত!
যেন কোনো অদৃশ্য লেখক আকাশের ওপরে বসে দুই জীবনের গল্প একই কালি দিয়ে লিখে রাখে।
রাকিব খবরটা পড়তে পড়তে চুপ হয়ে যায়।
তার মনে হয়, সময় বড় বিচিত্র জিনিস।
একদিন যে দুই মানুষ একে অপরকে হারানোর জন্য মাঠে নামে, আজ তারা দাঁড়িয়ে আছে একই সংখ্যার সামনে।
বিশ বছর এগারো দিন।
একটি সংখ্যা।
একটি বিস্ময়।
একটি দীর্ঘ যাত্রা।
দোকানের বাইরে বৃষ্টি পড়তে শুরু করে।
সোহেল ধীরে বলে,
—জানিস, আমি ছোট থাকতে ভাবি রোনালদো কোনোদিন বুড়ো হবে না।
রাকিব হেসে ফেলে।
—আমি ভাবি মেসি কোনোদিন পৃথিবী ছেড়ে যাবে না।
কথাগুলো বলার পর দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
বয়স বাড়ে।
চুল পাকে।
দৌড় কমে যায়।
কিন্তু কিংবদন্তিরা অদ্ভুতভাবে মানুষের জীবনের অংশ হয়ে থাকে।
মেসি যখন প্রথম বিশ্বকাপে গোল করেন, তখন অনেক দর্শকই ছাত্র।
আজ তাদের কারও সন্তান স্কুলে যায়।
রোনালদো যখন ইরানের জালে বল পাঠান, তখন অনেকের বিয়েই হয় না।
আজ তাদের ছেলেমেয়েরা বিশ্বকাপ দেখে।
সময় শুধু ফুটবলারদের বয়স বাড়ায় না। দর্শকদেরও বড় করে দেয়।
বৃষ্টি আরও জোরে নামে।
কাশেম মিয়া দোকানের টিনের চালের দিকে তাকিয়ে বলে,
—এই দুইজনের ঝগড়া করতে করতে আমার দোকানে কত কাপ চা বিক্রি হয়, হিসাব রাখলে আমিও বিশ্বরেকর্ড করতাম!
আবার হাসি ওঠে।
কিন্তু হাসির মাঝেও এক ধরনের বিষণ্নতা থেকে যায়।
কারণ সবাই বুঝতে পারে, এই গল্প শেষের দিকে এগোচ্ছে।
মেসি এখন ঊনচল্লিশের দরজায়।
রোনালদো একচল্লিশ পেরিয়ে যান।
শরীরের গতি কমে, কিন্তু ইতিহাসের গতি কমে না।
তাই আজ দেখা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমস্ত দেয়াল পেরিয়ে তারা এসে দাঁড়ায় একই বিন্দুতে।
যেন দুই নদী বহু দূর থেকে যাত্রা শুরু করে শেষ বিকেলে সমুদ্রের বুকে এসে মিশে যায়।
রাকিব জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।
সোহেলও তাকিয়ে থাকে।
আজ তাদের মধ্যে তর্ক নেই।
আজ তারা শুধু দুই কিংবদন্তির দীর্ঘ পথচলা দেখে।
আর মনে মনে স্বীকার করে, শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্কের চেয়েও বড় কিছু আছে।
সেটা হলো অধ্যবসায়।
সেটা হলো সময়কে হার না মানা।
সেটা হলো বিশ বছর পরও স্বপ্ন দেখে যাওয়া।
বৃষ্টির শব্দে রাত আরও গভীর হয়।
টেলিভিশনের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে।
কিন্তু দুই মানুষের নাম জ্বলতে থাকে।
মেসি।
রোনালদো।
দুই প্রতিদ্বন্দ্বী।
দুই কিংবদন্তি।
আর শেষ পর্যন্ত—দুজনই একই সমতলে।
জীবনে প্রতিযোগিতা মানুষকে আলাদা করে, কিন্তু দীর্ঘ সাধনা ও নিষ্ঠা শেষ পর্যন্ত মানুষকে একই সম্মানের আসনে বসায়। প্রকৃত মহত্ত্ব প্রতিপক্ষকে হারানো নয়, সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকা।
লন্ডন, ২৫ জুন ২০২৬