উগ্রবাদে অভিবাসীদের জীবন অনিশ্চিত, ইউরোপজুড়ে বাড়ছে বিদ্বেষ ও হেইট ক্রাইম

অভিবাসীরা এখন ইউরোপের টার্গেট !

অভিবাসীরা এখন ইউরোপের টার্গেট !

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৬ ডিসেম্বর: 

ইউরোপের রাজনীতি এখন অভিবাসন ইস্যুকে কেন্দ্র করে তীব্রভাবে মেরুকৃত। ব্রিটেনে Reform UK, জার্মানিতে AfD, ফ্রান্সে Rassemblement National—এই দলগুলো অভিবাসনকে ‘জাতীয় পরিচিতি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। তাদের বক্তব্য—বহিরাগতদের উপস্থিতি চাকরি, সামাজিক সেবা ও সংস্কৃতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

লন্ডনের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে শোনা গেছে—‘তাদের বের করে দাও’, ‘আমরা আমাদের দেশ ফেরত চাই’। লক্ষ্য ছিল সেই মানুষগুলো, যারা বছরের পর বছর ধরে ব্রিটেনের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ও সমাজ গড়ে তুলেছেন। এই দৃশ্য শুধু ব্রিটেনের নয়। জার্মানি, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি থেকে শুরু করে ইউরোপের বহু দেশেই অভিবাসীবিরোধী মনোভাব এখন প্রকাশ্য ও আগ্রাসী।

ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থী ও অভিবাসীরা মোট জনসংখ্যার তুলনায় এখনও সংখ্যালঘু। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান বিদ্বেষের পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ব্রেক্সিট-পরবর্তী অনিশ্চয়তা, কোভিড–পরবর্তী সামাজিক বিভাজন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও উসকানির বিস্তার।

লন্ডনের কিংস কলেজের পলিসি ইউনিটের পরিচালক ববি ডাফির মতে, ‘জাতিগত স্বতন্ত্রতা’ বা আমরা বনাম তারা—এই ধারণা ভয়ংকরভাবে রাজনৈতিক পুঁজি হয়ে উঠেছে। কুইনস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ কিরেন কনেল বলেন, যে বক্তব্য একসময় উগ্র বলে প্রত্যাখ্যাত হতো, তা এখন নির্বাচনী মঞ্চের মূল ভাষা।

ব্রিটিশ সরকারের পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি হেট ক্রাইম নথিভুক্ত হয়েছে, যার বড় অংশই অভিবাসী ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপের উগ্র অভিবাসীবিরোধী দলগুলোর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিয়েছেন। ফ্রান্সের Rassemblement National-এর নেতা জর্ডান বারডেলা প্রকাশ্যে বলেছেন, ব্যাপক অভিবাসন ইউরোপের অর্থনীতি ও সভ্যতার ভারসাম্য নষ্ট করছে।

ব্রিটেনে Reform UK ক্ষমতায় এলে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। কনজারভেটিভ পার্টি বলছে, অপরাধে জড়িত দ্বি-নাগরিকদের বহিষ্কার করা হবে। এরই মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ এমপি ডন বাটলারসহ বহু রাজনীতিবিদ ও অ্যাক্টিভিস্ট হুমকি ও বিদ্বেষমূলক আক্রমণের শিকার হচ্ছেন।

তবে প্রতিরোধও আছে। লেবার পার্টি ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন অভিবাসনকে ব্রিটেনের ইতিহাস ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তুলে ধরে বিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

প্রায় ২ কোটি বাংলাদেশি অভিবাসী ফিরে গেলে কী প্রভাব পড়বে?

বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় স্তম্ভ প্রবাসীরা। প্রায় দুই কোটি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন, যার বড় অংশ ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে। তাদের পাঠানো রেমিটেন্সেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ টিকে থাকে, গ্রামীণ অর্থনীতি সচল থাকে, লাখো পরিবার দারিদ্র্যসীমার ওপরে অবস্থান করতে পারে।

যদি রাজনৈতিক চাপ, বৈষম্য ও বহিষ্কারের ফলে এই বিপুল সংখ্যক প্রবাসী দেশে ফিরতে বাধ্য হন, তার প্রভাব হবে বহুমাত্রিক ও গভীর।
প্রথমত, রেমিটেন্সে ভয়াবহ ধস নামবে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট বাড়বে, আমদানি ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়বে, টাকার ওপর চাপ আরও বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থানের সংকট তৈরি হবে। দেশে ফেরত আসা লাখো দক্ষ ও অর্ধদক্ষ শ্রমিকের জন্য পর্যাপ্ত কাজ নেই। এতে বেকারত্ব, সামাজিক অস্থিরতা ও দারিদ্র্য বাড়বে।
তৃতীয়ত, গার্মেন্টস শিল্প ও কৃষি খাত চাপের মুখে পড়বে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থেই এই খাতগুলোর ভোক্তা বাজার বড় থাকে। রেমিটেন্স কমলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমবে, উৎপাদন ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
চতুর্থত, সামাজিকভাবে তৈরি হবে হতাশা ও ক্ষোভ, যা অপরাধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে উসকে দিতে পারে।

অর্থাৎ, অভিবাসন সংকট শুধু ইউরোপের সমস্যা নয়; এর ঢেউ সরাসরি আঘাত হানবে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতায়।

 অভিবাসীদের করণীয় কি ?

  • স্থানীয় কমিউনিটি ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সুরক্ষা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলুন

  • হেট ক্রাইম ও বৈষম্যের ক্ষেত্রে আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকুন

  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ও উসকানিমূলক তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকুন

  • রাজনৈতিক ভয়কে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে দেবেন না

  • স্থানীয় সমাজে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত থাকুন

  • আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করুন