মধ্যরাতে সিলেটে পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে দুই দফা ভূমিকম্প

মধ্যরাতে সিলেটে পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে দুই দফা ভূমিকম্প

সিলেট প্রতিনিধি, ১১ ডিসেম্বর : সিলেটে মধ্যরাতের নীরবতা ভেঙে মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে দু’দফা ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। বুধবার (১০ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত ২টা ২০ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে প্রথম কম্পন এবং ২টা ২৫ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে দ্বিতীয় কম্পন আঘাত হানে। হঠাৎ পরপর দুটি ভূমিকম্পে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে নগরী ও আশপাশের উপজেলাগুলোতে।

ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজির তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৩ দশমিক ৫। এর গভীরতা ছিল ২০ কিলোমিটার। পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে আসা দ্বিতীয় ভূকম্পনের মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৩ এবং গভীরতা ৩০ কিলোমিটার। উভয় ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চল।

একাধিক অঞ্চলে একই রাতে ভূমিকম্প

সিলেটের পর রাত ৩টা ৩৮ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে বঙ্গোপসাগর এলাকায় ৪ দশমিক ৩ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার গভীরতা ছিল ১৫ কিলোমিটার। একই রাতে আরও আগে, রাত ২টা ৫৪ মিনিট ৩ সেকেন্ডে মিয়ানমারের উত্তর মান্দালয় থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে ৩ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাতের খবর নিশ্চিত করে ভারতের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র।

কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশে ধারাবাহিক ভূমিকম্প


গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বারবার ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটছে।
৪ ডিসেম্বর ভোর ৬টা ১৫ মিনিটে রাজধানী ঢাকায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল টঙ্গী থেকে ৩৩ কিলোমিটার উত্তর-উত্তরপূর্বে এবং নরসিংদীর ৩ কিলোমিটার উত্তরে।

১ ডিসেম্বর মাঝরাতে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে ৪ দশমিক ৯ মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমার। এর আগে ২১ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে নরসিংদীর মাধবদীর ভূমিকম্পটি ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ৫ দশমিক ৭। ওই ভূমিকম্পে৩ জেলায় মোট ১০ জনের মৃত্যু এবং কয়েক শত মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।

সিলেটে আতঙ্ক, তবে ক্ষয়ক্ষতির খবর নেই


সিলেট জেলার বিভিন্ন এলাকায় রাতের ওই পরপর দুটি ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠে। অনেকেই ঘুম থেকে জেগে বাড়ির বাইরে বের হয়ে আসেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

ভূতাত্ত্বিকরা বলছেন, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভূকম্পন-প্রবণ অঞ্চল হওয়ায় এই ধরনের ছোট মাত্রার কম্পন নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক ভূমিকম্পের কারণে জনগণকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সিলেট কেন ভূমিকম্পের জেন্ঞ্জার জোন?

আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে  ভূমিকম্পের তিনটি বলয় বা জোন চিহ্নিত করা হয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জোন উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সর্বাপেক্ষা কম ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা প্রতিষ্ঠান আর্থ অবজারভেটরির গবেষক অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার জানান, সিলেট উত্তর-পূর্বাঞ্চল জোনে থাকায় এখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। ‘ডাউকি ফল্ট হচ্ছে বাংলাদেশের উত্তরপূর্ব কোণের সিলেট অঞ্চলে। কিন্তু, এই ফল্টের অবস্থান সিলেট জেলার সীমান্ত উপজেলা গোয়াইনঘাট  ছাড়িয়ে ভারতের ভেতরে।’ 

ভূগর্ভস্থ ইন্ডিয়ান টেকটোনিক প্লেটের একটি ফাটল, ডাউকি ফল্টের অবস্থান সিলেটের খুব কাছাকাছি। যে কারণে সিলেট ভূমিকম্পের ডেঞ্চার জোন 'অতি ঝুঁকিপূর্ণ'। বিগত দিনে ভূমিকম্পে অসংখ্যবার কেঁপে ওঠেছে সিলেট। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ভূমিকম্প হলে সিলেটে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

উল্লেখ্য, সিলেট সিটি করপোরেশনের বর্তমান আয়তন ৭৯ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার। ২০২১ সালে সীমানা বর্ধিত করার পূর্ব পর্যন্ত আয়তন ছিল ২৬ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার। পূর্বের আয়তনের তালিকাভুক্ত হোল্ডিংয়ের সংখ্যা প্রায় ৭৪ হাজার। এর মধ্যে দুই থেকে ২১তলা পর্যন্ত ভবন রয়েছে ৪১ হাজার ৯৯৫টি। 

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও পুর প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম বলেন, ‘সিলেটের ভবনগুলো গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিভাবে। ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশ ভবনই ভূমিকম্পের কথা চিন্তা না করে তৈরি করা হয়েছে। এগুলো ভূমিকম্প প্রতিরোধকভাবে নির্মাণ করা হয়নি। ফলে সাত মাত্রার ভূমিকম্প হলেই ৮০ শতাংশ বহুতল ভবন ভেঙ্গে পড়তে পারে।’