ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ১১ ।। আমি আর কার জন্য বাঁচবো?
।। আমি আর কার জন্য বাঁচবো? ।।
।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।
উৎসর্গ
এই গল্পটি উৎসর্গ করা হলো—নীরবভাবে হারিয়ে যাওয়া সকল নিরপরাধ জীবনের স্মরণে

টিনের ছোট্ট ঘর। বর্ষায় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। শীতের রাতে বাতাস জানালার ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকে যায়। সংসারে টাকার অভাব নিত্যদিনের সঙ্গী। তবু এই ঘরেই সুখ বাসা বাঁধে। কারণ এখানে মানুষগুলো একে অপরকে খুব ভালোবাসে।
মা শাহিনুর বেগম (৪০) সারাদিন সংসারের কাজ সামলান। বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২০) মাকে সাহায্য করে। ইকরা আক্তার (১৭) বই নিয়ে বসে স্বপ্ন দেখে একদিন বড় মানুষ হবে। আর সবার ছোট শিফা আক্তার (১০) সারাক্ষণ ঘরময় ছুটে বেড়ায়। একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলাম সিফাত (১৮) পড়াশোনার পাশাপাশি বাজারের একটি দোকানে মাসে আট হাজার টাকা বেতনে কাজ করে। বাবা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাওয়ার পর এই ছেলেটাই সংসারের ভরসা হয়ে দাঁড়ায়।
রাতে সবাই একসঙ্গে বসে ভাত খায়। মাছ না থাকলেও গল্প থাকে, হাসি থাকে। মা প্রায়ই বলেন,
— গরিব হইছি তো কী হইছে? আমরা একসঙ্গে আছি, এটাই সবচেয়ে বড় সম্পদ।
সেদিন সকালেও সবকিছু স্বাভাবিকই থাকে। সিফাত কাজে বের হওয়ার সময় মা বলেন,
— তাড়াতাড়ি ফিরিস বাবা।
ছোট্ট শিফা পেছন থেকে দৌড়ে এসে বলে,
— ভাইয়া, আমার জন্য একটা লাল কলম আনবা কিন্তু!
সিফাত হেসে মাথা নাড়ে।
কয়েক ঘণ্টা পর বাজারে কাজ করার সময় হঠাৎ এক প্রতিবেশী ছুটে আসে।
— সিফাত... তুই এখনই বাড়ি চল!
তার গলায় আতঙ্ক। মুখে কোনো রঙ নেই।
সিফাত ছুটতে থাকে। বাড়ির সামনে পৌঁছে মানুষের ভিড় দেখে তার বুক কেঁপে ওঠে।
সে ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ায়।
যে ঘরে একটু আগেও হাসির শব্দ ছিল, সেই ঘরের মেঝেতে এখন রক্তের দাগ।
কেউ একজন ঘরে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মা শাহিনুর বেগম, বড় বোন সায়মা, মেজো বোন ইকরা এবং ছোট বোন শিফা —চারজনকেই নির্মমভাবে হত্যা করে চলে গেছে।
সিফাত প্রথমে কিছুই বুঝতে পারে না। তারপর ধীরে ধীরে ছোট বোনের পাশে বসে পকেট থেকে লাল কলমটি বের করে রাখে।
— শিফা... দেখ, তোর কলমটা আনছি...
নিস্তব্ধ ঘর কোনো উত্তর দেয় না।
সে মায়ের হাত ধরে কাঁপা গলায় ডাকে,
— মা... আমি আইছি... উঠো...
মায়ের হাত ঠান্ডা। কোনো সাড়া নেই।
হঠাৎ সিফাতের বুকফাটা আর্তনাদে পুরো বাড়ি কেঁপে ওঠে।
— আমি আর কার জন্য বাঁচবো?
চারপাশে উপস্থিত মানুষ মাথা নিচু করে কাঁদে। কিন্তু তার প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই।
ঠিক তখনই তার চোখ পড়ে দেয়ালে টাঙানো একটি পারিবারিক ছবির দিকে। পাঁচটি মুখই সেখানে হাসছে। ছবিটা যেন নীরবে বলছে—একটি ঘাতক চারটি প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু একটি পরিবারের ভালোবাসাকে কখনো হত্যা করতে পারে না।
পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ সে নয়, যার অনেক টাকা আছে; সবচেয়ে ধনী সেই, যার ঘরে অপেক্ষা করে কয়েকটি প্রিয় মুখ। আর সেই মুখগুলো হারিয়ে গেলে, পুরো পৃথিবী থেকেও মানুষ নিজেকে নিঃস্ব মনে করে। তাই জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন-এভাবে প্রতিদিন কত সিফাত আর নিঃশ্ব হয়ে পথে পথে ঘুরবে?
লন্ডন, ২৮ জুন ২০২৬